দু’চোখ বেয়ে অশ্রু টপ টপ করে মাটিতে পড়ছে

ডেস্ক নিউজ | শনিবার, জানুয়ারী ১৬, ২০১৬

দু’চোখ বেয়ে অশ্রু টপ টপ করে মাটিতে পড়ছে

দু’চোখ বেয়ে অশ্রু টপ টপ করে মাটিতে পড়ছে। ডান হাত বাম হাত দিয়ে চোখের পানি মুছছে। কোন কথা জিজ্ঞাসা করলে তাকিয়ে থাকে। অনেক পরে মুখ খুলে বলল, ‘আমি স্কুলে যাওয়ার পথে এটা সেটা সাদত (দিতে চেষ্টা করতো)। আমি নিতে চাইতাম না। একদিন আমার নানি আমাকে বাড়িতে রেখে ডাক্তারের কাছে গেলে, এই সুযোগে সে আমাদের ঘরে ঢুকে। আমাকে নানা কথা বলে।

বলে তুমি অসহায়। তোমার বাবা নেই। তুমি নানীর বাড়িতে থাক। পড়া লেখা করো কষ্ট করে। তুমি আমার সাথে প্রেম করো আমি তোমাকে বিয়ে করবো এবং তোমার মাকে দেখাশুনা করবো। তোমাকে আর নানীর বাড়িতে থাকতে হবে না।

আমাদের বাড়িতে বিলডিং আছে তোমার মাকেসহ নিয়ে আসবো। এমনি ভাবে যখনই নানি বাড়িতে থাকতো না তখনই সে আমাদের বাড়িতে আসতো। তার বাড়ি আমার নানীর বাড়ির পাশেই। পর একদিন আমার শরীর খারাপ হওয়াতে নানীর কাছে তার ঘটনা খুলে বলি। নানীকে বলে দেওয়াতে সে আমাকে ফেলে বিদেশ চলে যায়’।

এই বলেই গর্ভবতী শিশুটি আর কথা না বলে কান্না করতে লাগলো। এই স্পর্শকাতর ঘটনা ঘটিয়েছেন সফিক মিয়া (২৫)। সফিক কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার টনকী ইউনিয়নের চৈনপুর গ্রামের কনু মিয়ার ছেলে।

ঘটনার শিকার শিশুটি টনকী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেনীর ছাত্রী। সে নানীর বাড়িতে থেকে পড়া-লেখা করতো।

মেয়েটির মা মাফিয়া খাতুন থানায় এসে বিষয়টি জানালে ওসি সরেজমিনে গিয়ে ছেলের বাবা কনুমিয়াকে গতকাল বুধবার বিকালে গ্রেফতার করেন। পরে নারী শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা রুজু করেন। মেয়েটিকে জেলা হসপিটালে পাঠান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য।

মেয়েটির মা মাফিয়া খাতুন বলেন, আমার মেয়ে পড়া লেখায় ভাল। আমি গরিব মানুষ। তার পড়া লেখার ব্যয় ভার বহন করতে কষ্ট হতো। এই কারণে আমার মা বলেন, আমি অসুস্থ্য থাকি তোর মেয়ে যেহেতু পড়ালেখায় ভাল আমার বাড়িতে থেকে আমাকে দেখার পাশা-পাশি পড়ালেখা চালিয়ে যাবে। মায়ের কথায় রাজি হয়ে মেয়েকে মার সাথে দিয়ে দেই। গত দু’মাস আগে মেয়ে আমার অসুস্থ্য এমন খবরে বাপের বাড়ি ছুটে যাই। মেয়েকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে ডাক্তার বলে সে গর্ভবতী। ডাক্তারের পরামর্শে পরীক্ষা করে জানলাম সে ৫ মাসের গর্ভবতী।

মেয়ের মুখ থেকে সব শুনে ছেলের বাবাকে বিষয়টি জানাই। প্রথমে আমাকে পাত্তা দেয়নি। পরে গ্রামের সাহেব সর্দারকে বিষয়টি জানাই। তারা একটা সমাধান করে দিবে বলে একাধিক বার বৈঠক বসার তারিখ দেয়। কিন্তু দু’মাস গত হয়ে গেলেও কেই এই বিষয় নিয়ে কোন কথা বলে না। গত কয়েক দিন আগে জানতে পারি ছেলে সৌদি আরব চলে গেছে। ছেলের বাবাও পালিয়ে থাকেন। জানতে পারি গ্রামের সর্দারদের মুখ কিনে নিয়েছেন। তাই তারা আর এই বিষয় নিয়ে মুখ খুলেন না। এখন আমার মেয়ে ৭মাসের গর্ভবতী। নিরুপায় হয়ে পড়ি। পরে এক সাংবাদিকের পরামর্শে থানায় এসে বড় স্যারকে জানাই।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, অসহায় মা মেয়েকে নিয়ে সমাজের অনেকের কাছে গিয়ে কোন সুফল পাননি। সমাজের অনেকেই অসহায় মা মেয়ের পাশে না দাঁড়িয়ে ছেলের বাবার কাছ থেকে সুবিধা নিয়েছেন। এদিকে ছেলের বাবা সুযোগ বুঝে ছেলেকে বিদেশে (সৌদিআরব) পাঠিয়ে দিয়েছেন।

টনকি স্কুলের প্রধান শিক্ষক গাজিউল হক বলেন, এই ছাত্রীটির পঞ্চম শ্রেণীতে রোল ছিল এক। আচার-আচরণে শান্ত ছিল বলে সবাই তাকে আদর করতো অন্যদের চেয়ে একটু বেশি। স্কুলে তার অনু-উপস্থিতি টের পেয়ে বাড়িতে খবর নিয়ে দেখি সে অসুস্থ্য। পরে এঘটনা জানতে পেরে আমি ও আমার সহকর্মীরা কষ্ট পাই। এঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার হওয়ার দরকার।

ওসি মিজানুর রহমান বলেন, স্কুল ছাত্রীর মায়ের কাছে এই ঘটনা শুনে সরেজমিনে গিয়ে প্রাথমিক ভাবে ঘটনার সত্যতা পাই। পরে নারী শিশু নির্যাতন দমন আইনে মেয়ের মা বাদী হয়ে মামলা করেন। ছেলের বাবাকে গ্রেফতার করি। মেয়ের মেডিকেল পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে প্রেরণ করি। মামলার প্রথম আসামি সফিক পলাতক রয়েছে।