কুড়িগ্রামে ইউপি চেয়ারম্যান ও পিআইও’র যোগসাজশে ২০৫ মে. টন ত্রাণের চাল আত্মসাৎ

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি, | রবিবার, আগস্ট ৭, ২০১৬
কুড়িগ্রামে ইউপি চেয়ারম্যান ও পিআইও’র যোগসাজশে
২০৫ মে. টন ত্রাণের চাল আত্মসাৎ
কুড়িগ্রামের ৫ উপজেলার ১০ ইউনিয়নে দু’দফায় বরাদ্দকরা ২০৫ টন ত্রাণের চাল লোপাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। যার সরকারি মূল্য ৬৫ লাখ টাকা। মানা হয়নি ‘মানবিক সহায়তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন নির্দেশিকা’। এ তথ্য যাচাই করতে গেলে একটি প্রভাবশালী চক্র বিষয়টি ধামাচাপা দিতে মাঠে নামে। এ নিয়ে প্রশাসনে চলছে তোলপাড়। কুড়িগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. জাফর আলী ত্রাণের চাল আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়নকে ম্লান করে দিচ্ছেন কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধি। তিনি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
জানা যায়, কুড়িগ্রাম জেলার ৯ উপজেলায় দীর্ঘস্থায়ী বন্যা পরিস্থিতিতে যখন ঘরে ঘরে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট বিরাজ করছে, তখন সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ত্রাণ তৎপরতা জোরদার করছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ত্রাণসামগ্রী নিয়ে বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি। একই সঙ্গে ত্রাণসামগ্রী নিয়ে অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার হুশিয়ারি দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। এরকম পরিস্থিতিতে কুড়িগ্রামে জিআর (জেনারেল রিলিফ/খয়রাতি চাল) বরাদ্দের ২০৫ টন চাল লোপাট করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে সরকারের গচ্চা গেছে ৬৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা। দরিদ্রদের জন্য বরাদ্দ এ চাল লোপাটের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে চিলমারী, উলিপুর, ফুলবাড়ী, রাজারহাট ও ভুরুঙ্গামারী উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) এবং ১০ ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। অনুসন্ধানের এ খবর ফাঁস হওয়ায় প্রশাসনে তোলপাড় শুরু হয়েছে। চলছে প্রভাবশালীদের দিয়ে ম্যানেজ প্রক্রিয়া।
অনুসন্ধানে জানা যায়, জেলা প্রশাসক খান মো. নুরুল আমিন স্বাক্ষরিত বরাদ্দপত্রে চিলমারী উপজেলার রানীগঞ্জ ইউপিতে ১৫ টন, চিলমারী সদর ইউপিতে ১০ টন, উলিপুর উপজেলার ধরনীবাড়ী ইউপিতে ২০ টন, ফুলবাড়ী উপজেলার শিমুলবাড়ী ও নাওডাঙ্গা ইউপিতে ১০ টন করে ২০ টন এবং রাজারহাট উপজেলার রাজারহাট সদর ইউনিয়নে ১০ টন জিআর চাল বরাদ্দ দেয়া হয়। একইভাবে ২৯ জুন অপর এক বরাদ্দপত্রে ফুলবাড়ী উপজেলার শিমুলবাড়ী ও নাওডাঙ্গা ইউপিতে ১৫ টন করে ৩০ টন, উলিপুরের হাতিয়ায় ২০ টন, চিলমারীর নয়ারহাটে ২০ টন ও রানীগঞ্জে ১০ টন এবং ভুরুঙ্গামারী উপজেলার পাইকেরছড়া ইউপিতে ও পাথরডুবি ইউপিতে ২০ টন করে ৪০ টন জিআর চাল বরাদ্দ দেয়া হয়। ঈদুল ফিতরের আগে সরকার বিপুল পরিমাণ ভিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে জনপ্রতি ২০ কেজি করে চাল বিতরণ করে। এ ডামাডোলে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ইউপি চেয়ারম্যান ও পিআইওরা এ বিপুল পরিমাণ ত্রাণের চাল আত্মসাৎ করে। কাগজে-কলমে দেখানো হয় বিতরণ। অথচ রিলিফ বিতরণে সংশ্লিষ্ট ট্যাগ অফিসার, ইউপি সচিব, ইউপি মেম্বার এবং উপকার ভোগী কেউ জানেন না জিআরের চাল বিতরণের ঘটনা। ফুলবাড়ীর নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি হাসেন আলী অভিযোগ করে বলেন, এ ইউনিয়নে দু’দফায় বরাদ্দ পাওয়া ২৫ টন জিআরের চাল পুরোটাই লোপাট করা হয়েছে। রিলিফের এক ছটাক চালও দারিদ্র মানুষের হাতে পৌঁছেনি। একই অভিযোগ শিমুলবাড়ী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শরীফুল ইসলাম সোহেলের বিরুদ্ধে। এখানেও ২০ টন চাল আত্মসাৎ করা হয়েছে। নাওডাঙ্গা ইউপির ট্যাগ অফিসার আবদুস ছাত্তার ও শিমুলবাড়ী ইউপির রিলিফ বিতরণের দায়িত্বপ্রাপ্ত ট্যাগ অফিসার (সংযুক্ত রিলিফ অফিসার) একরামুল হক জানান, তারা ওই ৫০ টন জিআরের চাল বিতরণ সম্পর্কে কোনো তথ্য জানেন না। এজাতীয় বিতরণ সিটে স্বাক্ষরও করেননি। পিআইও সবুজ কুমারগুপ্ত দাবি করেন, যথাযথ প্রক্রিয়ায় জি.আরের চাল বিতরণ করা হয়েছে এবং এ সংক্রান্ত মাস্টাররোল এখন তার হাতে। কিন্তু ট্যাগ অফিসার ও ইউপি সচিবকে অবহিত না করে কেন বিতরণ দেখানো হল, তার কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
উপজেলা খাদ্য পরিদর্শক মো. আবদুল আউয়াল বলেন, দুই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ২৬ ও ৩০ জুন স্বাক্ষর করে ৫০ টন জিআর চাল গোডাউন থেকে উত্তোলন করেন। প্রতি টন চালের সরকারি মূল্য ৩২ হাজার টাকা। চিলমারী উপজেলার তিন ইউনিয়নে বন্যায় প্লাবিত নিম্নাঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত, অসচ্ছল গরিব, দুস্থ ও অসহায় পরিবারের মাঝে বিতরণের জন্য জিআরের ৬০ টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়। রানীগঞ্জ ইউপি চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল ইসলাম প্রথমে তার ইউনিয়নে দু’দফায় ৩০ টন জিআর বরাদ্দ পাওয়ার কথা অস্বীকার করেন। সুনির্দিষ্টভাবে বরাদ্দপত্রের কথা উল্লেখ করা হলে তিনি বলেন, ভিজিএফের চালের সঙ্গে এসব বিতরণ করা হয়েছে। ট্যাগ অফিসার আবদুল হামিদ ও ইউপি সচিব আবু বকর সিদ্দিক এ সম্পর্কে কিছুই জানেন না। চিলমারী সদর ইউনিয়নে বরাদ্দ ১৫ টন সম্পর্কে কোনো তথ্যই জানেন না ট্যাগ অফিসার জাহিদ হোসেন আনছারী। নয়ারহাট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান দাবি করেন, ভিজিএফের ৪০ টন চালের সঙ্গে জিআর ২০ টন চাল তিনি বিতরণ করেছেন। তার এ দাবির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন ট্যাগ অফিসার সাখোয়াত হোসেন ও ইউপি সচিব মফিদুর রহমান।
চিলমারী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) সিরাজ উদ্দৌলা জানান, জিআর বিতরণের মাস্টার রোল তার হাতে আছে। এর বাইরে কিছু জানাতে অস্বীকৃতি জানান।
উলিপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) সাজিনুর রহমান জানান, ৪০ টন জিআরের চাল ঈদের আগে ভিজিএফের চালের সঙ্গে বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু ধরণীবাড়ী ইউনিয়নের সচিব মাহামুদুল হাসান রানু দাবি করেন, জিআরে ২০ টন চাল বিতরণ করা হয়নি। রাজারহাট ও চিলমারী উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, আমার জানামতে জিআরের চাল বিতরণ করা হয়েছে। অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।
ভুরুঙ্গামারী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) রবিউল ইসলাম জানান, যখন যেটা বরাদ্দ আসে তা সঙ্গে সঙ্গে বিতরণ করা হয়। জিআরের ওই ৪০ টন চালও বিতরণ করা হয়েছে মর্মে চেয়ারম্যানরা কাগজপত্র দাখিল করেছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে গিয়ে এর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আবদুল মোত্তালিব মোল্লা জানান, জেলা প্রশাসক জিআর বরাদ্দে ৫টি শর্ত যুক্ত করে দিয়েছেন। এক, মানবিক সহায়তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন নির্দেশিকা ২০১২-১৩ অনুসরণপূর্বক ব্যয় নিশ্চিত করতে হবে। দুই, ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়াকে অবহিত করতে হবে। তিন, বরাদ্দপ্রাপ্ত ইউএনওরা নিজ নিজ ওয়েবসাইটে বরাদ্দপত্র আপলোড করবেন। চার, উপ-বরাদ্দকৃত জিআর চাল শুধু বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ৩০ কেজি হারে ট্যাগ অফিসারের উপস্থিতিতে অবশ্যই বিতরণ করতে হবে। পাঁচ, নিরীক্ষার জন্য যাবতীয় কাগজপত্র নিজ কার্যালয়ে সংরক্ষণ করতে হবে। এসব শর্তের একটি পূরণ না হলেও জেলা পর্যায় থেকে মনিটরিংয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। এখন পর্যন্ত এসব মাল বিতরণ করা হয়েছি কিনা, এমন তথ্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নেই।