বিলুপ্তির পথে গরুর হালচাষ

মোঃ মাহ্ফুজুর রহমান, রাজবাড়ী প্রতিনিধি | রবিবার, মার্চ ১, ২০১৫
বিলুপ্তির পথে গরুর হালচাষ

রাজবাড়ী জেলা শহেরর বিভিন্ন এলাকায় জমি চাষের জন্য পাওয়ার টিলারের প্রচলন চোখে পড়ার মতো। যা ভুলে যাবার নয়, এক সময় ছিল যখন গোলা ভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ ও গোয়াল ভরা গরু আর মাঠের নিবীর নিরালয়ে রাখালের বাঁশির সুর। এসবই গ্রাম বাংলার কৃষকদের প্রাচীন ঐতিহ্য হলেও বর্তমানে আধুনিকতার ছোয়ায় সেই ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রাম বাংলার প্রতিটি ঘর থেকে। এমনি ভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামের সেই গরু দিয়ে হাল চাষ।

জানা গেছে, এক সময় বাণিজ্যিক ভাবে কৃষক গরু পালন করতো হাল চাষ করার জন্য। গ্রামের অনেক বাড়িতে শুধু জমিতে হাল চাষ করার জন্য কিছু মানুষ গবাদি পশুর হাল চাষকে পেশা হিসেবে ব্যবহার করত। নিজের সামান্য জমি টুকুর পাশাপাশি অন্যের জমিতে হাল চাষ করে তাদের সংসারের ব্যয় নির্বাহ হতো।

গরু দিয়ে হাল চাষে সময় লাগলেও জমি মালিকরা অপেক্ষা করে হলেও পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে হাল চাষের ব্যবস্থা করতো। সিরিয়াল মতো তারা জমিতে হাল চাষ দিয়ে নিত। হালের গরু কিনে দরিদ্র মানুষ জমি চাষ করেই তাদের পরিবারে স্বচ্ছলতা ফিরে পেত।

রাজবাড়ীর সদর উপজেলা মূলঘর ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামের বাসিন্দা মোঃ জলিল সেক(৭০) কে এ ব্যপারে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, তখন আমার বয়স ৯/১০ হবে। ছোট বেলায় বাবা-মা মারা যায় আমার। ছোট বেলা থেকে চাচার সাথে হাল চাষের কাজ করতাম।

বাড়িতে হাল চাষের বলদ গরু ছিল ২ জোড়া। চাষের জন্য দরকার হতো বলদ গরু ১ জোড়া ,কাঠ-লোহার তৈরি লাঙ্গল, জোয়াল, চৌঙ্গ(মই), নড়ি (বাঁশের তৈরি গরু তাড়ানো লাঠি), গরুর মুখের টোনা এই লাগতো আমাদের।  আমিই তো প্রায় ১২ বছর আগ থ্যাইকা শরীর খারাপের জন্যে হাল চাষ ছাইরা দিছি। খুব কষ্ট লাগে। এখন তো আর তা নাই হইছে নতুন নতুন ম্যাশিন, তাই দিয়ে এখনকার লোকজন চাষাবাদ করে।

গোয়ালন্দ উপজেলার ছোট ভাকলা ইউনিয়নের চরবালিয়াকান্দি গ্রামের হালচাষী কৃষক ফজলু সেক(ফজো) বলেন,  গরু দিয়ে হাল চাষ করলে জমিতে ঘাস কম হতো, যখন গরু দিয়ে হাল চাষ করা হতো অনেক সময় গরুর গোবর সেই জমিতেই পড়তো।

এতে করে জমিতে অনেক জৈব সার হতো এই জন্য ফসল ভালো হতো। হালের গরু গোবর আমরা বাড়ি থেকে জমিতে দিতাম। সার কেনা লাগতো কম। পরিবেশ দুষণ কম হতো। গরু গোবর দিয়ে তৈরি করা হতো ঘোষি ও ফাটকুরির (পাটকাঠি) সাথে গোবর দিয়ে বুইন্দা বানানো হতো। রান্নার কাজে কাঠ এ সব ব্যবহার করতাম। কাঠ লাগতো না।  

তিনি আরো বলেন, আমি প্রতিদিন এক বিঘা জমি চাষ করতে পারতাম। বলদ দিয়ে চাষ করতে লাঙ্গল ব্যবহার করতে হতো। লাঙ্গল জমিতে অনেক খানি মাটির নিচ দিয়ে জমি চাষ করা যেত। উপরের মাটি নিচে পড়তো আর নিচের মাটি উপরে। এখন তো আর তা নেই। ম্যাশিনের গন্ধ সয়না শরীরে। মেশিনের ধোয়া আর তেল পোড়া গন্ধ শরীরের অনেক ক্ষতি করে।  আমরা মাঝে মাঝে জমিতে ধনিচা চাষ করতাম। হাত খানেক লম্বা হলে আমরা লাঙ্গল দিয়ে চাষ দিতাম জমিতে। শিক্ষিত লোকের মুখে শুনছি, ধুনিচা গাছে সবুজ সার হয়। জমির জন্য উপকার।

গোয়ালন্দ উপজেলার দেওয়ান পাড়া গ্রামের মোঃ জুয়েল দেওয়ান দুঃখের সাথে বলেন, ধীরে ধীরে পাওয়ার টিলারের প্রচলন হওয়ায় গরু দিয়ে হাল চাষের কদর কমে গেছে। কম সময়ে বেশী জমিতে চাষ দিতে সক্ষম হওয়ায় জমির মালিকরা পাওয়ার টিলার দিয়ে জমি চাষ করে নিচ্ছে। এক সময় গরুই হাল চাষের একমাত্র মাধ্যম ছিল। বর্তমানে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি আসায় কৃষি ক্ষেত্রে অনেক সাফল্য আসছে বলে তারা স্বীকার করেন।

যে সমস্ত কৃষক গরু দিয়ে হাল চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করতো। কালক্রমে তারা পেশা বদলীর অন্য যে কোন ভাবে উপার্জনে নেমেছেন। এছাড়া মানুষ বৃদ্ধিও পাশাপাশি জমি বৃদ্ধি পাচ্ছে না। ঘর-বাড়ি তৈরি করতে জমি কমে যাচ্ছে। গরু বিষ্ঠার তৈরি সবুজ সারের পরিবর্তে রাসায়নিক সার ব্যবহার করার ফলে মাটির উর্বরতা শক্তি দিন দিন কমে যাচ্ছে।

বর্তমান গরু দিয়ে হাল চাষের কদর না থাকায় ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে। হাল চাষে আধুনিক প্রযুক্তি হিসেবে পাওয়ার টিলারের প্রচলন হওয়ার ধীরে ধীরে গ্রামের ঐহিত্য গরু দিয়ে হাল চাষ বিলুপ্তি হয়ে যাচ্ছে। এর মাঝেই গ্রামের অনেক কৃষক জমি চাষের জন্য গরু দিয়ে হাল চাষের পদ্ধতি টিকিয়ে রেখেছে। হয়তো অল্প দিনের মধ্যে কৃষি ক্ষেত্রে আরো আধুনিক যন্ত্রপাতির সহজলভ্যতার কারণে একবারেই হারিয়ে যাবে গবাদি পশুর হাল চাষ পদ্ধতি।




আপরাধ সংবাদ /শ্রাব