নাটোরের সিংড়ায় জোড়াখুনের ঘটনায় আতংকিত জনপদ বড়গাঁ গ্রাম

তাপস কুমার, নাটোর: | বুধবার, নভেম্বর ২৩, ২০১৬
নাটোরের সিংড়ায় জোড়াখুনের ঘটনায়
আতংকিত জনপদ বড়গাঁ গ্রাম
নাটোরের সিংড়ায় সাবেক ইউপি মেম্বর মোজাফফর হোসেন মোজাই ও তার বড় ভাই হাছেন আলী হত্যার ঘটনায় আতংকিত জনপদে পরিনত হয়েছে উপজেলার ডাহিয়া ইউনিয়নের বড়গাঁ গ্রাম। সন্ধ্যা নামলেই নেমে আসে নিরবতা। গ্রামের মানুষ আতংকে দিনাতিপাত করছে। জোড়াখুন মামলার বাদী পক্ষের চাঁদাবাজী, হুমকি, ধামকি এবং নিরীহ লোকজনদের মামলায় জড়ানোর অপচেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ কারনে ঝামেলা এড়াতে গ্রাম ছেড়েছে প্রায় দুই শতাধিক নারী পুরুষ।
এদিকে জোড়াখুন ঘটনার পরে মামলার প্রধান আসামী বর্তমান ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য ইউনুস আলী ও অন্যতম আসামী ইয়াসিনকে আইন শৃংখলা বাহিনীর লোকজন ধরে নিয়ে গেছে বলে দাবী করেছে তাদের পরিবার। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছে, গত ১৮ই আগষ্ট আশুলিয়া এলাকা থেকে ইউনুস,ইয়াসিন,শামিম ও রুহুলকে আটক করে আইন শৃংখলা বাহিনীর লোকজন। আটকের শামিম ও রুহুলকে গ্রেফতার দেখানো হলেও ইউনুস ও ইয়াসিনের সন্ধ্যান এখনো পাওয়া যায়নি।
বিভিন্ন সুত্র ও স্থানীয়রা জানায়, গত ২৮মে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সামান্য ভোটের ব্যবধানে ইউনুস আলীর কাছে পরাজিত হন মোজাফফর হোসেন মোজাই। এ নিয়ে উভয় পক্ষের লোকজনদের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। গত ৫ই আগষ্ট বর্তমান মেম্বর ইউনুস আলীর বাড়ির পাশে নির্মম ভাবে খুন হন সাবেক মেম্বর মোজাই ও তার বড় ভাই হাছেন।
এঘটনায় মোজাইয়ের স্ত্রী রাবেয়া বাদী হয়ে সিংড়া থানায় ইউনুস সহ ১৮জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাতদের নামে হত্যা মামলা দায়ের করে। ঘটনার পর থেকে হামলা, মামলা ও ঝামেলা এড়াতে গা ঢাকা দিয়েছে স্থানীয় অনেকে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাদী পক্ষের লোকজন বাড়ি বাড়ি গিয়ে মোটা অংকের চাঁদা আদায় করছে। হামলা ও মামলার ভয় দেখাচ্ছে। মামলায় ৭জন মহিলাকেও আসামী করা হয়েছে বলে জানিয়েছে তারা। তাছাড়া আসামীর তালিকা যেমন বাড়ছে তেমনি হয়রানীও বাড়ছে। স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক,আওয়ামী লীগ নেতা, ব্যবসায়ি,ছাত্র-ছাত্রী,কৃষক,শ্রমিকসহ গ্রামের সাধারণ মানুষ রয়েছে আসামীদের তালিকায়। এদের মধ্যে শিক্ষক রয়েছে মাসদার ও আঃ সালাম শিক্ষার্থী রয়েছে হালিমা,আল আমিন, মিলন, আওয়ামী লীগ নেতা সোলাইমান, কৃষক পঙ্গু ইউনুস আলী ও রাজু সহ আরো অনেকে।
ইউনুসের স্ত্রী বেদেনা জানায়, বাদী পক্ষের লোকজন তাদের ২৮বিঘা জমির আমন ধান কাটতে দেয়নি যা জমিতেই নষ্ট হয়ে গেছে। তাছাড়া নিজস্ব পুকুরে মাছ মারতে দেয় না। বাদী পক্ষের মোবারক, মজনু, শামীম, মকুল, শফি, সোহরাব, আসাদ ও আতাইয়ের নেতৃত্বে বিভিন্ন সময় প্রাণ নাশের হুমকি ধামকি, বাড়ি ঘেড়াঁও ও মেয়েদের অশালিন গালিগালাজ দেয়া হচ্ছে।  
পঙ্গু ইউনুসের স্ত্রী কাজল রেখা জানান, তার স্বামী পঙ্গু। সে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ে। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ইউনুস আলীকে সমর্থন করায় তাকে আসামী করা হয়েছে।
বুলবুলি,শামিম,নাছের,রাজিয়া,ইউনুস আলী জানায়, তাদের স্বজনরা আসামী থাকায় বাড়ি ঘেড়াঁও করে চাঁদা দাবী,মারপিটসহ প্রতিনিয়ত স্বাভাবিক কর্মকান্ডে বাঁধা প্রদান করা হচ্ছে। আমরা আতংকের মধ্যে বসবাস করছি।
বাদী পক্ষের মহসিন (মোজাইয়ের ছোট ভাই) জানান, আমার দু’ভাইকে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়েছে। বিবাদী পক্ষের লোকজন দোষ ঢাকতে এলাকায় বিভিন্ন অপপ্রচার চালাচ্ছে। বাঁকি আসামীরা এখনো এলাকায় বুক ফুলিয়ে চলাফেরা করছে। তিনি ন্যায় বিচারের স্বার্থে এদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবী জানান।
ডাহিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম এম আবুল কালাম জানান, এলাকা এখনো থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। দুপক্ষের লোকজনদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। নিরীহ কেউ যেন হয়রানীর শিকার না হয় সেদিকে আইন শৃংখলা বাহিনীর নজর দেয়া উচিত।
সিংড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নাসির উদ্দিন মন্ডল জানান, বড়গাঁওতে জোড়াখুনের ঘটনায় ইতিমধ্যেই ১৪জন আসামীকে আটক করা হয়েছে। এরমধ্যে শামিম ও শাহাদত আদালতে হত্যায় জড়িত মর্মে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। বাঁকিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। বাদী পক্ষের বিভিন্ন অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অপরাধ করলে অপরাধীদের বিচার আইন অনুযায়ী হবে। তবে তাদের পরিবারের উপর হয়রানি করা যাবে না। নিরীহ কেউ যেন হয়রানির স্বীকার না হয় সেদিকে পুলিশ তৎপর রয়েছে।
উল্লেখ্য, ৫ই আগষ্ট বর্তমান মেম্বর ইউনুস আলীর বাড়ির পাশে নির্মম ভাবে খুন হন সাবেক মেম্বর মোজাই (৪২) ও তার ভাই হাছেন (৫৫)। গভীর রাতে উপজেলার দুর্গম এলাকা ডাহিয়া ইউনিয়নের বড়গাঁ তে এই হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে। এসময় নিহতের অপর সহোদর মহসিন আলী (৩৫) গুরুতর জখম হয়। হতাহতরা বড়গাঁয়ের মৃত আব্দুস সোবাহানের ছেলে। মোজাফ্ফর হোসেন মোজাই স্থানীয় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য ও ইউনিয়ন পরিষদের ৬নং ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য ছিলেন। ঘটনার পরেরদিন সকালে প্রতিবেশীরা পুলিশে খবর দিলে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে লাশ উদ্ধার করে নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করে।