এখনও স্মৃতি বহন করে দাঁড়িয়ে আছে সৌন্দর্যমন্ডিত নাটোরের রাজবাড়ী

তাপস কুমার, নাটোর: | বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ১৫, ২০১৬
এখনও স্মৃতি বহন করে দাঁড়িয়ে আছে
সৌন্দর্যমন্ডিত নাটোরের রাজবাড়ী
বাংলাদেশের বৃহত্তম চলনবিলের সৌন্দর্যমন্ডিত মফস্বল শহর নাটোর। এখানে রয়েছে মন মুগ্ধ করার মতো অনেক কিছুই। চলনবিলের সৌন্দর্যের সঙ্গে এখানে অবস্থিত নাটোর রাজবাড়ী আর দিঘাপতিয়ার উত্তরা গণভবন ইতিহাসের স্মারক হিসেবে নাটোরকে করেছে আরো সমৃদ্ধ ও দেশ এবং বিদেশে পরিচিতি। আমাদের দেশের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যেও মধ্যে শত শত বছরের পুরোনো রাজবাড়ীগুলো অন্যতম।
এই রাজবাড়ীগুলোর ঐশ্বর্য আমাদের বুঝিয়ে দেয় যে কতটা সমৃদ্ধ ছিল বাংলা, কত রাজার পা পড়েছে এই বাংলায়। এক কথায় এসব হচ্ছে ইতিহাসের জীবন্ত প্রমাণ। তেমনি একটি হচ্ছে নাটোররে রাজবাড়ী। মহারানী ভবানীর স্মৃতিবিজড়িত এই রাজবাড়ী। বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকাজুড়ে যে কটি রাজবাড়ী তাদের স্থাপত্য- শৈলী ও ইতিহাস দিয়ে পর্যটকদের আকৃষ্ট করে আসছে তার মধ্যে নাটোরের রাজবাড়ী অন্যতম। এই রাজবাড়ীর রয়েছে একটি সুদীর্ঘ ইতিহাস। রাজা রামজীবন নাটোর রাজবাড়ীর প্রথম রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন ১৭০৬ মতান্তরের ১৭১০ খ্রিস্টাব্দে। তিনি ১৭৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন এবং সেই বছরেই মৃতুবরণ করেন। সম্ভবত ১৭০৬ থেকে ১৭১০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ৪৯.১৯২৫ একর জমির উপর নাটোর রাজবাড়ী নির্মিত হয়েছে। রাজা রামজীবনের মৃত্যুর পর রামকান্ত ১৭৩৪ খ্রিস্টাব্দে নাটোরের রাজা হন। অনেকের মতে ১৭৩০ থেকে ১৭৩৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজা রামজীবনের দেওয়ান দয়ারাম নাটোররের তত্বাবধান করতেন। রাজা রামকান্ত তাাঁর মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত অর্থাৎ ১৭৪৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত নাটোরের রাজত্ব করেন। রামজীবনের জমিদারির রাজধানী নাটোরের স্থাপনকে কেন্দ্র করে অনেক বিচিত্র জনশ্রুতি আছে। যেমন মায়ের আদেশে রাজা রামজীবন ও রঘুনন্দন নিজ জন্মভূমিতে রাজধানী স্থাপনের জন্য উপযুক্ত একাট স্থানের সন্ধান করতে থাকেন। এক বর্ষাকালে রঘুনন্দন রাজা রামজীবন ও পন্ডিতবর্গ নৌকায় চড়ে রাজধানী স্থাপনের জন্য উযুক্ত স্থান নির্বাচনে বের হন। ঘরে ঘুরে তাঁরা ভাত ঝাড়া বিলের মধ্যে উপস্থিত হন। বিলের একটি স্থানে তাঁরা দেখতে পেলেন, দুটি সাপ সাঁতরে বিল পার হচ্ছে এবং একটি ব্যাঙ ছোট একটি সাপকে গিলে খাচ্ছে। পন্ডিতবরর্গ সেই স্থানেই রাজধানী নির্মাণের পরামর্শ দেন। রাজা এই স্থানে রাজবাড়ী নির্মাণ করবেন বলে স্থির করেন।  রাজবাড়ী নির্মাণ করার পর রাজ- আমলা, কর্মচারী বহুবিধ লোকের সমাগমে অল্পদিনের মধ্যে বিলটি একটি শহরে পরিণত হয়। সেই পরিণত শহরই নাটোর, সেই রাজবাড়ীটিই নাটোর রাজবাড়ী। তারপর বহুদিন হয়ে গেছে, নাটোর রাজবাড়ী এখন অবহেলা ও অযন্ত অবস্থায়। তবুও ঐশ্বর্যে সে বিস্ময় এখনি জেগে আছে। রাজবাড়ীটিতে দেখেরামত অনেক কিছু আছে। রাজবাড়ীর প্রবেশমুখেই বিশাল শানবাঁধানো পুকুর, রাজবাড়ীর আঙ্গিনাই রয়েছে বিশাল আটটি শিবমন্দির। মন্দিরগুলোতে খেনো রীতি মেনে নিয়মিত পূজা-অর্চনা করা হয়। দৃষ্টিনন্দন এই মন্দিরগুলো মুগ্ধ করে পর্যটকদের, মন্দিরের দেয়ালজুড়ে রয়েছে প্রাচীন টেরাকোটার শিল্পকর্ম। মন্দিরকে ঘিরে আছে একটি শিবমূর্তি, ফণা তোলা সাপের মূর্তি, লালন ফকিরের মূর্তিসহ নানা রকমের শৈল্পিক কারুকাজ। উপরে ওঠার জন্য প্রতিটি ভবনের পাশেই রয়েছে লোহার তৈর‌্য ঘোরানো সিঁড়ি। ঘুরতে ঘুরতে চোঁখে মিলে যাবে রাণীর মহল। এই মহলটিতেই বাস করতেন রাণী ভবানী। এলাকার সচেতন মহল রাজবাড়ীটি পর্যটটকদের জন্য পুরাতন নির্দশন গুলি সংরক্ষন করে রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সদয় দৃষ্টি কামনা করেন।