সিদ্ধিরগঞ্জে ‘পাখি উড়ে গেছে পড়ে আছে পাখা’

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি | শুক্রবার, জানুয়ারী ২০, ২০১৭
সিদ্ধিরগঞ্জে ‘পাখি উড়ে গেছে পড়ে আছে পাখা’
সাত খুন মামলার প্রধান আসামি নুর হোসেন ওরফে নুরার মৃত্যুদণ্ডের রায় হওয়ার পরও মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না এলাকাবাসী। কারণ নূর হোসেন সশরীরে নেই বটে, কিন্তু তার ‘সাম্রাজ্য’ আছে, আছে তার বাহিনীর লোকজন। তারা কেউ  নুর হোসেনের প্রকৃতি থেকে আলাদা নন। এ যেন ‘পাখি উড়ে গেলে পড়ে থাকে পাখা’।

সাত খুন মামলার রায় নিয়ে বিশেষ করে থানার বাসিন্দা হিসেবে নুর হোসেনের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে অনেক সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছেন এই প্রতিবেদক। কিন্তু কথা বলতে রাজি নন কেউ। তাদের মধ্যে ভয়, আতঙ্ক।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সাধারণ মানুষের এই ভয় সিদ্ধিরগঞ্জের একসাময়ের ত্রাস নুর হোসেনের ক্যাডার বাহিনী ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা। আছে তার ভাই-ভাতিজা ও ঘনিষ্ঠজনরা। তারাই এখন নিয়ন্ত্রণ করছেন নুর হোসেনের সা¤্রাজ্য। পরিবহন সেক্টর, সরকারি জায়গা দখল করে মার্কেট নির্মাণ, নদীর পাড়ে বালু-পাথরের ব্যবসা, ফুটপাতে চাঁদাবাজিসহ সব অবৈধ আয়ের উৎসের নিয়ন্ত্রণ এখন তাদের হাতে। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে নুর হোসেনের ক্যাডাররা। নুর হোসেনের ছায়া হয়ে পুরো সিদ্ধিরগঞ্জে তাদের আধিপত্য।

সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ভয়ে-আতঙ্কে আছেন সাত খুনের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনরাও। সাত খুন মামলার বাদী নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটিকে নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। শঙ্কা প্রকাশ করে বিউটি বলেন, ‘নুর হোসেনের লোকজন মৌচাক এলাকায় ঘোরাফেরা করে। এ কারণে ছেলেমেয়ে নিয়ে শঙ্কার মধ্যে আছি।’ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে একটি উড়ো চিঠি দিয়ে তাকে দেখে নেয়ার হুমকি দেয়া হয়েছিল। এ ঘটনায় তখন তিনি সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও করেন।  

সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সহসভাপতি নুর হোসেন শুধু ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের শিমরাইল মোড় নয়, পুরো সিদ্ধিরগঞ্জ তথা নারায়ণগঞ্জ জুড়ে ছিল তার দুর্দ- প্রতাপ। চলাফেরা ছিল সিনেমার ভিলেনদের মতো। সামনে-পেছনে থাকত গাড়ির বহর, আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে আট-দশজন দেহরক্ষী। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় বা কোথাও যাওয়া-আসার  সময় মহাসড়কের গাড়ি থামিয়ে দেয়া হতো তার গাড়িবহর যাওয়ার জন্য।   

সেই ত্রাস নুর হোসেন কারাগারে বন্দি এক বছরের বেশি সময় ধরে। কিন্তু তার সম্পর্কে কিছু জানতে চাইলে এখনো অনেকে এড়িয়ে যান কিংবা কেটে পড়েন। আবার অনেকে তার সম্পর্কে কিছুই জানেন না বলে জানান। মূলত ভয়ে-আতঙ্কে সিদ্ধিরগঞ্জের মানুষ মুখ খুলতে চায় না। আবার যারা কিছু কথা বলেছেন তারা কোনোভাবেই নাম প্রকাশ করেননি। তাদের ভাষ্য, নুর হোসেনের বাহিনীর নানা লোকজন বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয়। কখন কে কী শুনে ফেলে, তাই মুখ বন্ধ রাখাই ভালো মনে করেন তারা।

কোথায় হাত দেননি নুর হোসেন! সিদ্ধিরগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীর তীর দখল করে বালু-পাথরের ব্যবসা, চুনা ফ্যাক্টরিতে চাঁদাবাজি, জমি দখল; পরিবহন সেক্টর, ফুটপাত, ট্রাকস্ট্যান্ডে চাঁদাবাজি, মেলার নামে অশ্লীল যাত্রা, জুয়ার আসর, মাদক ব্যবসা ওপেন সিক্রেট ছিল তার কাছে। আর এসব আধিপত্য বজায় রাখতে গিয়ে খুন-খারাপির অভিযোগ উঠেছে অনেক সময়। আরো অভিযোগ আছে, স্থানীয় প্রভাশালী রাজনৈতিক এক নেতার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে নুর হোসেন এসব অপকর্ম করতেন। স্থানীয় পুুলিশ প্রশাসন ছিল নীরব দর্শক।   

এসব অবৈধ কাজকর্ম এখন নুর হোসেন সরাসরি দেখভাল না করলেও তার ভাই, ভাতিজা, ঘনিষ্ঠজন ও শিষ্যরা দখল বজায় রেখেছেন। সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল পুলিশ বক্সের সামনে ফুটপাতের চাঁদা আদায় করেন তার ভাতিজা বর্তমান কাউন্সিলর শাহজালাল বাদল। পুলিশ বক্সের পেছনের পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গা দখল করে বিশাল টিনশেট ও আধাপাকা মার্কেট নির্মাণ করে দোকান ভাড়া দিয়েছেন তিনি। নুর হোসেনের অবৈধ টাকা আয়ের প্রধান উৎসগুলো মূলত কাউন্সিলর বাদলের হাতেই।  তবে বাদলের পক্ষে মার্কেট নির্মাণের কাজ দেখাশোন করেন ফয়সাল হোসেন নামের একজন। দোকান বরাদ্দ নেয়ার জন্য ফয়সাল হোসেনের মোবাইল ফোনের নম্বর দিয়ে সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। ওই নম্বরে তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি নিজের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেন।

পরে কাউন্সিলর শাহজালাল বাদলের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে রং নম্বর বলে ফোন রেখে দেন। পরে কয়েক দফা ফোন দিলেও তিনি তা ধরেননি।  

এ ছাড়া শিমরাইল ট্রাকস্ট্যান্ড নিয়ন্ত্রণ করছেন নুর হোসেনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী সিটি করপোরেশনের ৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আরিফুল হক হাসান।

এভাবেই কারাগারে বন্দি নুর হোসেন আছেন সিদ্ধিরগঞ্জে। তার সা¤্রাজ্য আছে বহাল তবিয়তে। নুর হোসেন থেকে মুক্তি মেলেনি সিদ্ধিরগঞ্জবাসীর।