ঝিনুকের মালায় সংসার চলে শহীদ কবিরের স্ত্রীর

বলরাম দাশ অনুপম, কক্সবাজার থেকে | রবিবার, ডিসেম্বর ১৭, ২০১৭
ঝিনুকের মালায় সংসার চলে শহীদ কবিরের স্ত্রীর
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলার দামাল ছেলেরা বুকের তাজা রক্ত আর মা-বোনেরা নিজেদের ইজ্জতের বিনিময়ে যে লাল-সবুজের পতাকা ছিনিয়ে এনেছিল সে দেশেই আজ করুণ অবস্থায় বাস করছে বীর শহীদদের পরিবার। যেসব বীর শহীদের জীবনের বিনিময়ে বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশ হয়েছে আজ তাদের পরিবারের সংসারের করুণ পরিণতি। বৃষ্টিতে ভিজে আর রোদে শুকিয়ে দিন কাটাচ্ছেন শহীদ পরিবারের স্বজনরা। বৃদ্ধা বয়সে হাঁটুর উপর ভর করে ঝিনুকের মালা গেঁথেই সংসারের ঘানি টানছেন কক্সবাজারের শহীদ কবিরের বৃদ্ধা স্ত্রী আলমাছ খাতুন।

জানা যায়, ১৯৭১ সালে হানাদার বাহিনীর নির্মম নির্যাতনে নিহত হন কক্সবাজার শহরের নতুন বাহারছড়ার কবিরাজ কবির আহম্মদ। পরে ১৯৭২ সালে স্বীকৃতি পায় শহীদ কবিরের স্ত্রী আলমাছ খাতুন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেয়া সহানুভূতির চিঠি আর প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে দুই হাজার টাকা অনুদান সেই বছরেই পায় পরিবারটি। ওই বছরেই প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সাক্ষাৎও পেয়েছিলেন আলমাছ খাতুন। সেই প্রথম আর সেই শেষবারের মতো রাষ্ট্রীয় সম্মান পেয়েছিল পরিবারটি। এরপর থেকে আর কখনো কোনো সরকারই খবর নেয়নি শহীদ পরিবারের।

এর মধ্যে কেটে গেছে ৪৬টি বছর। হাঁটুর উপর ভর করে ঝিনুক আর শামুকের মালা গেঁথেই এক ছেলে ও এক মেয়েকে বড় করেছেন শহীদ কবির আহমদের স্ত্রী। তবে বিয়ে করে ছেলে মেয়ে দুজনেই আলাদা থাকছেন। আর বরাবরের মতোই আলমাছ খাতুন জীবন যুদ্ধে মেতে রয়েছেন। জীর্ণশীর্ণ কুড়ে ঘরে খেয়ে না খেয়ে ৭০ বছরের আলমাস খাতুন এখনো বেঁচে থাকার যুদ্ধ করছেন।

দীর্ঘ ৪৬ বছরে আলমাছ খাতুনের যেমন কেউ খোঁজ খবর রাখেনি তেমনি তিনিও কারো কাছে গিয়ে হাত পাতেনি। কক্সবাজার জেলা প্রশাসন কার্যালয় থেকে মাত্র ৫০০ মিটার দূরের এই নারীর কথা জানেই না জেলা প্রশাসনসহ জেলা আওয়ামী লীগ নেতারা। ৭২ এর পরে শহীদ পরিবারের ভাতা পাওয়া তো দূরের কথা বয়স্ক ভাতা ও বিধবা ভাতাও কখনো পাননি আলমাস খাতুন।

কথা হয় আলমাছ খাতুনের সাথে। তিনি ঢাকাটাইমসকে বলেন, ১৯৭১ সালের কোনো এক শুক্রবার বিকালে শহরের বাজারঘাটা থেকে গোলপাতা আর ঘরের ছাউনি কিনে বাড়ি ফিরছিলেন আমার স্বামী। পথিমধ্যে বর্তমান বনবিভাগের সামনে থেকে এদেশীয় দোসরদের সহযোগিতায় আমার স্বামীকে ধরে নিয়ে যায় পাক হানাদাররা। বর্তমানে যেখানে ইসলামিয়া আদর্শ কামিল মহিলা মাদ্রাসা সেখানেই ছিল পাক হানাদারদের ক্যাম্প। ওখানে নিয়ে বেনেটের গুতো দিয়ে দিয়ে আমার স্বামীসহ চারজনকে হত্যা করে পাষণ্ড হানাদার বাহিনী।

তিনি আরও বলেন, সে সময় হানাদার ক্যাম্পে খাবার ও পত্রিকা সাপ্লাইকারী এক লোক আমাকে বিষয়টি জানালে আমি সেখানে ছুটে যাই। সাথে ছিল আমার চার বছর বয়সী কন্যা শাহেনা আকতার ও নয় মাস বয়সী ছেলে নাছির উদ্দিন বাচ্ছু। কিন্তু সেখানে আমার স্বামীর সাথে দেখা করাতো দূরের কথা কথাও বলতে দেয়নি। পরে খবর পাই তারা আমাকে স্বামীকে হত্যা করে তার হাতে খোড়া কবরেই তাকে মাটি চাপা দিয়েছে। সেই থেকেই স্বামী হারানোর ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছি। ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চাগুলো নিয়ে কত যে কষ্ট আর যন্ত্রণায় কেটে গেল আমার জীবন! তা বলে বুঝাতে পারব না। জীবন বাঁচানোর জন্য শামুক ঝিনুক গেঁথে, মালা বানিয়ে বিক্রি করেছি। সুখে অসুখে ঝিনুক মালা গাঁথুনি ঠিকই ঠিক রেখেছি। এখন বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছি। এখন আর আগের মতো কাজ করতে পারি না।

আলমাছ খাতুন বলেন, স্বাধীনতার ৪৬ বছর পার হলেও কোনো সরকারই গণহত্যায় শহীদদের এই গণকবর সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়নি। রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করে কী লাভ হলো? আমার স্বামী ছিলেন নৌকার অন্ধ ভক্ত। যেখানে যেতেন সেখানেই নৌকার লিফলেট বিতরণ করতেন। একারণেই তাকে খুন করে হানাদার বাহিনী।

এদিকে কক্সবাজার শহরের নতুন বাহারছড়া গিয়ে দেখা যায়, বাশের বেড়া, উপরে পলিথিন দিয়ে তৈরি ঘরেই বসবাস করেছে শহীদ পরিবারটি। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া আলমাছ খাতুনের হাঁটুতে ব্যথা। এছাড়া রয়েছে নানা বার্ধক্যজনিত রোগ। তারপরও বেঁচে থাকার তাগিদে একের পর এক গেঁথে যাচ্ছেন ঝিনুকের মালা। জানতে চাইলে আলমাছ খাতুন ঢাকাটাইমসকে বলেন, বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎ পেয়েছি। চিঠি পেয়েছি। কিন্তু বর্তমান আওয়ামী লীগ আমার কিংবা আমার পরিবারের খবর কখনো নেয়নি। শুনেছি সরকার শহীদ পরিবারকে ভাতা দেয়। বিধবাদের বিধবা ভাতা ও বয়স্কদের বয়স্ক ভাতা দেয়। কিন্তু আমার কপালে কিছুই জুটল না।

এ বিষয়ে কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র মাহাবুবুর রহমান চৌধুরীর কাছে জানতে চাইলে তিনি ঢাকাটাইমসকে বলেন, আমি চলতি মাসের মধ্যেই ওই মহিয়সী নারী যাতে বয়স্ক ভাতা পায় সে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা ঢাকাটাইমসকে বলেন, আমি আপনার কাছ থেকেই ওই নারীর কথা শুনলাম। এর আগে কেউ কখনো আমাকে ওই শহীদ পরিবারের ব্যাপারে জানায়নি। আমি ব্যক্তিগত ও দলীয়ভাবে তার জন্য কাজ করব।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন ঢাকাটাইমসকে বলেন, শহীদ পরিবার হিসেবে ওই নারীর নাম নেই। দেখুন ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমাদের দেশে স্বাধীনতা এসেছে। তবে সবাইকে তো শহীদ পরিবারের মর্যাদা আমরা দিতে পারিনি। এটা আমাদের ব্যর্থতা। তবে সে নারী যেন এককালীন ভাতা ও বয়স্ক ভাতা কিংবা বিধবা ভাতা পান সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।