নড়াইলে সড়ক ও জনপথ বিভাগের ১৭০ কিলোমিটার এবং এলজিইডির ২ হাজার ২৯৫ কিলোমিটার সড়কে কৃষকরা গাড়ির চাকায় ফসল মাড়াই ঘটছে দুর্ঘটনা

উজ্জ্বল রায়, নড়াইল | শুক্রবার, মার্চ ১৬, ২০১৮
নড়াইলে সড়ক ও জনপথ বিভাগের ১৭০ কিলোমিটার এবং এলজিইডির ২ হাজার ২৯৫ কিলোমিটার সড়কে কৃষকরা গাড়ির চাকায় ফসল মাড়াই ঘটছে দুর্ঘটনা
সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের ১৭০ কিলোমিটার এবং এলজিইডির ২ হাজার ২৯৫ কিলোমিটার পাকা ও কাঁচা সড়কের অধিকাংশই এই কাজে ব্যবহার করছেন স্থানীয় কৃষকরা। নড়াইল-শেখহাটী সড়কটি নড়াইল জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। এ সড়কটি জেলা শহরের সাথে আফরা, শেখহাটি, নিরালী, বাহিরগ্রাম, কোড়গ্রাম, মুলিয়া, বনগ্রামসহ আরো কয়েকটি গ্রামের যোগসূত্র স্থাপন করেছে।  এতে চলাচলে সৃষ্টি হচ্ছে প্রতিবন্ধকতা, যানবাহনের চাকা পিছলে ঘটছে দুর্ঘটনা। নিষেধ করতে গিয়ে পথচারীদের স্থানীয়দের হাতে মার খাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। নড়াইলে ফসল শুকানো ও মাড়াইয়ের কাজে বাড়ির উঠোনের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে সড়ক-মহাসড়ক ও গ্রামীণ রাস্তা। সম্প্রতি কয়েকটি সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, কলাই, মসুর, সরিষা, গম কেটে রাস্তার ওপর বিছিয়ে রাখা হয়েছে। এর ওপর দিয়ে বাস, ট্রাক, ভ্যান, মোটরসাইকেল গেলে ফসল মাড়াইয়ের কাজটা হয়ে যায়। কৃষকরা এভাবে ফসল শুকানো, মাড়াই, খড় শুকানো, অবশিষ্ট অংশ ফেলা, বস্তায় ভরা— সব কিছুই করছে সড়কের ওপর। এতে গ্রামীণ সড়কে হেঁটে চলাচল করা প্রায় অসম্ভব। যানবাহনের চালক, যাত্রী ও পথচারীরা জানান, চাকায় এবং বিভিন্ন যন্ত্রাংশে ফসলের গাছ জড়িয়ে যাচ্ছে, ঘটছে দুর্ঘটনাও। বিশেষ করে বাইসাইকেল, ভ্যান, মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার ও অটোরিকশা চলাচলে বেশি সমস্যা হচ্ছে। নড়াইল-কালিয়া সড়কের অটোরিকশা ও বাসচালকরা জানান, সড়কে অনেক উঁচু করে কলাইসহ বিভিন্ন ফসল কেটে এনে বিছিয়ে রাখা হচ্ছে। জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কেও ফসল শুকানো হচ্ছে। হঠাৎ ব্রেক করলে চাকা পিছলে যায়। ওভারটেক করতে গেলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরো বাড়ে। তিন চাকার যান উল্টে যায়। মালবোঝাই গাড়ির নিয়ন্ত্রণ রাখা কঠিন হয়ে যায় বলে জানান ট্রাকচালক ফসিয়ার।নিয়মিত যাতায়াতকারীরা জানান, প্রায় ছয় মাস ধরে এভাবে চলছে। গাছসহ ফসল পড়ে থাকায় গাড়ির চাকা যেমন এলোমেলো চলছে, তেমনি প্রচণ্ড ধুলা ও খড়কুটায় শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। বৃষ্টি হলে ফসলের অবশিষ্ট অংশ পচে সড়কগুলো আরো পিচ্ছিল হয়ে যায় । ২০১৫ সালের ৯ এপ্রিল এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন শতশত বাইসাইকেল, মোটরসাইকেল, ভ্যান, ইজিবাইক, থ্রি-হুইলারসহ বিভিন্ন যানবাহন চলাচল করে লোহাগড়া উপজেলার জয়পুর এলাকায় সড়কে গম শুকাতে দেয়ায় মোটরসাইকেল পিছলে পড়ে এক আরোহী নিহত ও আরেক আরোহী আহত হন। গত ২২ ফেব্রুয়ারি নড়াইল-যশোর সড়কের বসুপটি এলাকায় কলাইয়ের স্তূপে পিছলে পড়ে মোটরসাইকেল আরোহী নড়াইলের তুলারামপুর এলাকার তালেব আলী আহত হন। একই মাসে লোহাগড়া-মহাজন রোডে ডান পায়ের হাঁটুতে আঘাত পান কুমড়ী গ্রামের আবু হাসান। সড়কে ফসল শুকানোসহ বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির কারণে দুর্ঘটনায় গত তিন বছরে শতাধিক যাত্রী ও পথচারী আহত এবং অন্তত পাঁচজন পঙ্গুত্ববরণ করেছেন বলে জানিয়েছেন নড়াইল জেলা অনলাইন মিডিয়া ক্লাবের সভাপতি উজ্জ্বল রায় বলেন, এসব দুর্ঘটনা চোখের সামনে ঘটলেও কৃষকরা নির্বিকার। প্রতিবাদ করলে উল্টো স্থানীয়দের হাতে লাঞ্ছিত হতে হয়। সম্প্রতি লোহাগড়া উপজেলার এড়েন্দা-আমাদা-লুটিয়া সড়কে খেসারি ডাল মাড়াইয়ের প্রতিবাদ করায় ভ্যানচালকসহ এক যাত্রীকে বেদম মারধর করেন এক যুবক। অন্যান্য সড়কেও পথচারী ও যাত্রীসাধারণের সঙ্গে অশালীন আচরণ এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে কৃষকদের দাবি, সড়কে ফসল মাড়াই বা শুকানোর কারণে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আর পাকা রাস্তায় ফসল মাড়াই করা ও শুকানো খুব সুবিধা। গাড়ির চাকায় দ্রুত মাড়াই হয়ে যায়। শুকানোও যায় খুব দ্রুত। নড়াইল জেলা অনলাইন মিডিয়া ক্লাবের সভাপতি উজ্জ্বল রায় বলেন, কয়েক বছর ধরে সড়ক গুলোয় ফসল মাড়াইয়ের এ দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। এ কারণে অনেক দুর্ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু কাউকে থামানো যাচ্ছে না। এদিকে সড়কে ফসল মাড়াই ও শুকানোর কারণে খেসারি, মসুর, ধান, গম, সরিষা, ধনে, তিল-জাতীয় শস্যের মধ্যে বালি, কাঁকড়, পিচের টুকরা, খোয়া, মাটি ও ময়লা-আবর্জনা মিশে যাচ্ছে। এতে স্বাস্থ্য ঝুঁকির পাশাপাশি ব্যবসায়িকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন নড়াইলের একাধিক বাজারের ব্যবসায়ীরা। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে জেলা প্রশাসক মো. এমদাদুল হক চৌধুরী নড়াইল জেলা অনলাইন মিডিয়া ক্লাবের সভাপতি উজ্জ্বল রায়কে জানান, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের নির্দেশনা দিয়েছি, যাতে কৃষকদের নিবৃত্ত করা হয়। এ ব্যাপারে সবাইকে সচেতন হওয়ারও পরামর্শ দেন তিনি। লোহাগড়া উপজেলার জয়পুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আকতার হোসেন নড়াইল জেলা অনলাইন মিডিয়া ক্লাবের সভাপতি উজ্জ্বল রায়কে জানান, প্রতিটি ওয়ার্ডে সংশ্লিষ্ট মেম্বারদের মাধ্যমে কৃষকদের নিষেধ করা হয়েছে কিন্তু তারা শোনেন না। তার পরও সপ্তাহ খানেকের মধ্যে আমার এলাকায় মাইকিং করে নিষেধ করা হবে। নড়াইল-শেখহাটী সড়কটি নড়াইল জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। এ সড়কটি জেলা শহরের সাথে আফরা, শেখহাটি, নিরালী, বাহিরগ্রাম, কোড়গ্রাম, মুলিয়া, বনগ্রামসহ আরো কয়েকটি গ্রামের যোগসূত্র স্থাপন করেছে। এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন শতশত বাইসাইকেল, মোটরসাইকেল, ভ্যান, ইজিবাইক, থ্রি-হুইলারসহ বিভিন্ন যানবাহন চলাচল করে। অথচ এই জনবহুল সড়কটিকে স্থানীয় বাসিন্দারা ফসল মাড়াই ও শুকানোর চাতাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। কিছুদিন পূর্বেও নড়াইল-শেখহাটী সড়কটির বেহাল দশা ছিল। সম্প্রতি রাস্তাটি পুনরায় সংস্কার করায় এলাকাবাসীর পথ চলার থেকে যেন ফসল মাড়াইয়ের কাজে বেশি সুবিধা হয়েছে। আর এ কারণে রাস্তা সংকীর্ণ হয়ে ছোট বড় দুর্ঘটনার সম্ভাবনা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। এই সড়কে চলাচলরত প্রত্যেকটি যানবাহনের চালকরা সর্বক্ষণ দুর্ঘটনার আতংকের মধ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করছেন। শুধু তাই নয়, কোনো কোনো পাকা সড়কে ফসল মাড়াইয়ের কাজ পর্যন্ত করতেও দেখা যাচ্ছে। মোট কথা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জ্ঞাতসারেই চলছে এমন ঝুঁকিপুর্ণ অবৈধ কাজ। এতে করে সড়ক চলাচলে জন ভোগান্তি চরমে উঠেছে। রাস্তা সংকুচিত হয়ে পড়ায় বাড়ছে দুর্ঘটনার আশংকা। সড়কে কলাই ফসল মাড়াই করছেন এমন লোকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এ মৌসুমে বাড়িতে কাঁচা মাটিতে ফসল মাড়াই ও শুকাতে বেশি সময় লাগে। তা ছাড়া বৃষ্টি বাদল, ঝড়ে ক্ষতিও হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই তারা নিরাপদ ও দ্রুত শুকানোর স্বার্থেই পাকা সড়কে ফসল শুকিয়ে থাকেন। নড়াইল সদর উপজেলার বাহিরগ্রামের আলতাফ মোল্যা নামের এক পথচারী বলেন, নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করে সড়ক বন্ধ করে সড়কের উপর ফসল মাড়াই ও শুকাচ্ছে স্থানীয় লোকজন। তিনি আরও বলেন, সড়কগুলো দেখলে মনে হয় চলাচলের জন্য সড়ক নয় এ যেন ফসল শুকানো ব্যক্তিদের পৈত্রিক সম্পত্তি। সরেজমিনে এ সড়ক ঘুরে দেখা যায়, রাস্তায় চলমান সকল যানবাহন দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলছে প্রতিনিয়ত, এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন কৃষক-কৃষানীসহ কৃষক পরিবারের ছোট- ছোট শিশু বাচ্চারা। সচেতন মহল মনে করছেন দুর্ঘটনা এড়াতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে যে কোন সময় ঘটতে পারে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।