এডির ওপর হামলার নেপথ্যে কাউন্সিলর মোস্তাকিম

প্রতীক ওমর, বগুড়া | শনিবার, মার্চ ৩১, ২০১৮

এডির ওপর হামলার নেপথ্যে কাউন্সিলর মোস্তাকিম
বগুড়া আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক (এডি) সাজাহান কবিরের ওপর হামলার নেপথ্যে ছিলেন পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সির ও যুবলীগের শহর শাখার দপ্তর সম্পাদক মোস্তাকিম রহমান। তাকে শুক্রবার সকালে দিনাজপুর থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

হত্যা, চাঁদাবাজি, অস্ত্র মামলাসহ পাঁচ মামলার আসামি মুস্তাকিমের ‘দখলে’ বগুড়া শহরের খান্দার, কৈগাড়ী, মালগ্রাম, শাকপালা এলাকা। দীর্ঘদিন ধরে তিনি এসব এলাকায় তার আধিপাত্য বিস্তার করে আছে। তার দাপটে এলাকায় কেউ কথা বলতে পারে না। গোহাইল রোডে যেসব সিএনজি অটোরিকশা চলাচল করে সেগুলো থেকে তার বাহিনী নিয়মিত চাঁদা আদায় করে। পুলিশ এসব আবহিত থাকলেও আইনি কোনো ব্যবস্থা নেয়নি তার বিরুদ্ধে। ফলে দিনের পর দিন তার সন্ত্রাসী কার্যক্রম বেড়েছে।

বগুড়া আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস মোস্তাকিমের এলাকায় হওয়ায় ইতোপূর্বে তিনি ও তার বাহিনী ওই অফিস থেকে নিয়মিত চাঁদা তুলত। মাস সাতেক আগে বগুড়া আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে যোগদানের পর বর্তমান সহকারী পরিচালক (এডি) সাজাহান কবির সেখান থেকে দালালদের বিতাড়ন করেন। পাসপোর্ট করতে আসা লোকজনের কাছে অফিসের কোনো কর্মচারী ঘুষ দাবি করলে, ঘুষ না পেয়ে খারাপ ব্যবহার করলে তাদের ব্যাপারে অভিযোগ জমা দেয়ার জন্য অফিসের খোলা জায়গায় স্বচ্ছ কাচের বাক্স স্থাপন করেন তিনি। এতে সাধারণ মানুষ কোনো হয়রানি ছাড়াই প্রয়োজনীয় কাজ সারতে পারে। ফলে অফিসের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবৈধ আয় আর দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধ হয়।

ফলে এডি সাহজাহানের প্রতি ক্ষুব্ধ দালাল নিয়ন্ত্রক ও অফিসের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তারই প্রতিফলন ঘটে বৃহস্পতিবার দুপুরে। রাস্তায় একা পেয়ে তার ওপর হামলা চালায় মোস্তাকিম বাহিনী।

পাসপোর্ট অফিস সূত্রে জানা যায়, গত মঙ্গলবার (২৭ মার্চ) মোস্তাকিম বাহিনীর কয়েকজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী এডি সাহজাহানের অফিসে গিয়ে তাকে জানান, আগের সহকারী পরিচালক বেকার যুবকদের বিভিন্ন কাজ করিয়ে নিয়ে প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা দিতেন। তাকেও প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা দিতে হবে। এ নিয়ে এডির সঙ্গে বাকবিতা-া হয়। পরের দিনেই হামলা হয় তার ওপর।

ওই দিন দুপুর দেড়টার দিকে অটোরিকশায় করে শহরতলীর শাকপালার বাড়ি যাচ্ছিলেন এডি সাহজাহান। পথিমধ্যে কৈগাড়ি এলাকায় বিভাগীয় বন অফিসের সামনে মোটরসাইকেলে আসা তিন দুর্বৃত্ত তার অটোরিকশার গতি রোধ করে। তিনি কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে রামদা দিয়ে ডান পায়ে কোপ দেয়। এ সময় তিনি রিকশা থেকে নেমে দৌড়ে বন অফিসের ভেতরে একটি কক্ষে আশ্রয় নেন। দুর্বৃত্তরা ওই কক্ষের দরজা ভেঙে তাকে বের করে কুপিয়ে ফেলে রেখে যায়। বন অফিসের কর্মচারীরা ওই মিয় পাশের মসজিদে নামাজ আদায় করছিলেন। পরে মসজিদ থেকে লোকজন এগিয়ে এলে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়।

পুলিশ ইতোমধ্যে ওই ঘটানর সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে কাউন্সিলর মোস্তাকিমসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

বগুড়ার পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভূঞা জানান, মোস্তাকিমের বিরুদ্ধে ২০১২ সালের ৩ নভেম্বর সুজন নামের এক যুবককে খুনের অভিযোগে হত্যা মামলা, একই বছরের ২ অক্টোবর একটি মারামারির মামলা, ২৩ এপ্রিল অস্ত্র মামলা. ২০১১ সালের ২ আগস্ট চাঁদাবাজির মামলা হয়। মামলাগুলো এখনো চলছে।

পুলিশ সুপার আরো জানান, এডির ওপর হামলার ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে বগুড়া পাসপোর্ট অফিসের অফিস সহকারী শাজেনুর আলম বাদী হয়ে মোস্তাকিমকে প্রধান আসামি ও আরো ১১ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। বৃহস্পতিবার রাতে জেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে চারজন এবং দিনাজপুরে হাকিমপুর উপজেলার ডাঙ্গাপাড়া সাতকুড়ি বাজার থেকে শুক্রবার সকালে মোস্তাকিমকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মোস্তাকিম বগুড়া শহর যুবলীগের দপ্তর সম্পাদক বলে নিশ্চিত করেছেন জেলা যুবলীগের সভাপতি শুভাশিস পোদ্দার লিটন।

শুক্রবার বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভূঞা জানান, কাউন্সিলর মোস্তাকিম দিনাজপুর হয়ে ভারতে পালানোর চেষ্টা করছিলেন। এমন সংবাদ পেয়ে দিনাজপুরের পুলিশকে বিষয়টি জানানো হয়। তাদের নজরদারিতে থাকেন মোস্তাকিম। পরে পুলিশ সদর দপ্তরের ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের সহযোগিতায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশ সুপার আরো জানান, মোস্তাকিমের বিরুদ্ধে এর আগে হত্যা মামলাসহ চারটি মামলা রয়েছে।

পাসপোর্ট অফিসের এডির ওপর হামলার ঘটনায় করা মামলায় গ্রেপ্তার অন্যরা হলেন- বগুড়া সদরের মালগ্রাম এলাকার রমজান আলীর ছেলে হাসান আলী (২৬), ঠনঠনিয়া হিন্দুপাড়ার আব্দুল কাদেরের ছেলে জীবন (২১), ঠনঠনিয়া মধ্যপাড়া এলাকার মৃত আবু তালেবের ছেলে রাসেল মিয়া (৩০) এবং মিলু।

বৃহস্পতিবার দুপুরে দুর্বৃত্তদের হামলায় গুরুতর আহত সাজাহান কবিরকে প্রথমে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য সন্ধ্যায় এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে নেয়া হয়।

সাজাহান কবিরের স্ত্রী নাহিদ কবির জানান, ওই দিন রাত দুইটা পর্যন্ত অস্ত্রেপচার করা হয় সাজাহান কবিরের। সেখানকার চিকিৎসকরা জানান, তিনি আশঙ্কামুক্ত, তবে ৭২ ঘণ্টা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে তাকে।