বউ-শ্বাশুড়ীকে হত্যার কথা স্বীকার করল দুই আসামী

কামরুল হাসান (হবিগঞ্জ) | শুক্রবার, মে ১৮, ২০১৮

বউ-শ্বাশুড়ীকে হত্যার কথা স্বীকার করল দুই আসামী

হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার সাদুল্লাপুর গ্রামে বউ-শ্বাশুড়ী খুনের রহস্য উন্মোচন হয়েছে। ধর্ষণের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়েই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে বলে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে আসামীরা।

বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সম্পা জাহানের আদালতে এই স্বীকারোক্তি দেয় তালেব মিয়া ও জাকারিয়া আহমেদ শুভ। গতকাল বিকাল সাড়ে ৫ টায় জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে এক প্রেসব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান পুলিশ সুপার বিধান ত্রিপুরা।

পুলিশ সুপার বলেন, সুন্দরী গৃহবধূ রুমি বেগমকে ধর্ষণ করতেই এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। রুমির স্বামী লন্ডনে থাকেন। আড়াই বছর আগে আখলাক চৌধুরীর সঙ্গে তার বিয়ে রুমির। যে বাড়িতে রুমি এবং তার শাশুড়ী মালা বেগম বসবাস করতেন সেটির কোনো সীমানা প্রাচীর ছিল না এবং পাশে কোনো প্রতিবেশীরাও বসবাস করতেন না। তিনি আরে বলেন, কয়েক দিন আগে লন্ডনে আখলাক চৌধুরী তার বন্ধু রিপনকে স্ত্রী রুমির জন্য একটি মোবাইলের কাভার কিনে দিতে বলেন।

রিপন ব্যস্ত থাকায় ১১ মে তার ভাই জয়কে দিয়ে এই কাভার রুমির বাড়িতে পাঠান তিনি। জয় মোবাইল কাভার নিয়ে যাওয়ার সময় ওই এলাকার জাকারিয়া শুভ নামে এক বখাটের সঙ্গে পরিচয় হয়। তখন জয়ের সঙ্গে বখাটে শুভ রুমীদের বাড়িতে যায়। জয় মোবাইল কাভারটি রুমিকে দিলে সেটি তার পছন্দ না হওয়ায় ফেরত দেন। এ সময় রুমিকে দেখে শুভ তাকে ধর্ষণের পরিকল্পনা করে। পুলিশ সুপার জানান- শুভ জানতে পারেন রুমিদের বাড়িতে অপরিচিত কেউ গেলে গেট খুলে দেয়া হয় না। পাশের ফারুক চৌধুরীর বাড়িতে কর্মরত শ্রমিক তালেব মিয়া মাঝে মাঝে ওই বাড়িতে গিয়ে কাজ করেন। শনিবার শুভ তালেব মিয়ার সঙ্গে দেখা করে তাকে একটি দোকানে অাপ্যায়ন করায় এবং মোবাইলে থাকা পর্নোগ্রাফি দেখায়।

এরপর তারা পরিকল্পনা করে রোববার (১৩ মে) রাতে গিয়ে লন্ডন প্রবাসীর স্ত্রী রুমি বেগমকে ধর্ষণ করবে। পুলিশের এ কর্মকর্তা জানান, রোববার রাত সাড়ে ১০টায় ওই বাড়িতে গিয়ে প্রথমে তালেব মিয়া মালা বেগমকে দাদি সম্বোধন করে ডাক দেয় এবং গেইট খুলতে বলে। গেইট খোলার পর তালেব মিয়ার সাথে শুভও ভেতরে চলে যায়। তখন মালা বেগম ওই ছেলের পরিচয় জানতে চাইলে শুভ এই সময়েই মালা বেগমকে ছুরি দিয় আঘাত করে। এ সময় মালা বেগম দৌড়ে ঘরে গেলে তারা দুইজন তাকে ওড়না দিয়ে বেধে ফেলে এবং ছুরি দিয়ে আঘাত করতে থাকে। মালা বেগমের চিৎকার শুনে পাশে থাকা রুমিও চিৎকার শুরু করেন।

এ সময় শুভ রুমীকেও ছুরি দিয়ে আঘাত করে। রুমি বেগম দৌড়ে ঘর থেকে বের হতে গেলে তালেব মিয়াও তাকে আঘাত করে। ঘটনার সময় ওই বাড়ির পাশে ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যের বাড়িতে মিটিং ছিল।

সেখান থেকে লোকজন চিৎকার শুনে গিয়ে মৃতদেহ দুটি দেখতে পান। এসপি বিধান ত্রিপুরা আরও জানান, উপজেলার আমতৈল গ্রামের আমীর হোসেনের ছেলে তালেব হোসেন (২৪) রুমি বেগমের গ্রামের বাড়ির লোক হওয়ায় সহজেই তাদের বাড়িতে আসা যাওয়ার সুযোগ পায়। অপরদিকে জাকারিয়া চৌধুরী শুভ (২০) বানিয়াচং উপজেলার খাগাউড়া গ্রামের হাফিজুর রহমানের ছেলে।

সে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করে এবং এলাকায় একজন বাখাটে হিসেবে পরিচিত। শুভ তার নানার বাড়িতে বসবাস করতো। তার বাবা অন্যত্র বিয়ে করে ছোট বেলাতেই শুভকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। এসপি বলেন, এই ঘটনায় প্রমাণ হয়েছে পারিবারিক বিশৃংখলা এবং অবাধ পর্নোগ্রাফি সমাজে অপরাধ সৃষ্টি করে। তিনি জানান, এত বড় ঘটনার পরও তালেব মিয়া এবং শুভ হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি এবং রক্তমাখা কাপড় ধুয়ে স্বাভাবিক চলাফেরা করতে থাকে। পরে পুলিশ তাদেরকে গ্রেফতারের পর বৃহস্পতিবার সকালে রক্তমাখা কাপড় এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরি উদ্ধার করা হয়। শুভর আরেক বন্ধুরও ধর্ষণে অংশ নেয়ার কথা ছিল। তাকেও খুঁজছে পুলিশ।

দ্রুত মামলাটির অভিযোগপত্র দাখিলের মাধ্যমে বিচার কাজ শুরু হবে। এর আগে রোববার রাত সাড়ে ১০ টার দিকে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তদের হাতে নিজ বাড়িতে খুন হয় বউ-শাশুড়ী। এ ঘটনায় সোমবার রাতে নিহত রুমির ভাই ডাঃ নজরুল ইসলাম বাদি হয়ে নবীগঞ্জ থানায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আসামী করে হত্যা মামলা দায়ের করেন।