‘দূতাবাসের কর্মকর্তারাও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করত’

নিজস্ব প্রতিবেদক | সোমবার, জুন ১১, ২০১৮
 ‘দূতাবাসের কর্মকর্তারাও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করত’

অল্প বয়সেই বাবা হারা হন বরিশালের শারমিন আক্তার (ছদ্মনাম)। মা খেয়ে না খেয়ে তাদের দুই বোনকে মানুষ করার চেষ্টা করেন। অভাবের সংসারে কিছুতেই স্বচ্ছলতা ফিরছিল না। তাই মা আর বোনকে দেশে রেখে সৌদি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এই তরুণী। কিন্তু ভাগ্যের কী নিষ্ঠুর পরিহাস! সৌদি শেখদের নির্যাতনের শিকার হয়ে নিঃস্ব হাতে দেশে ফিরতে হয়েছে শারমিনকে।

বিদেশে নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরে আসা ৭০ জন নারীকে নগদ অর্থ সহায়তা অথবা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে চাকরি দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক এবং লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোটার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এলএফএমইএবি)। সেই ৭০ নারীর একজন এই শারমিন আক্তার।

সোমবার ব্র্যাক সেন্টারে  সৌদি যাওয়া, শেখদের নির্যাতন, পালিয়ে দূতাবাসে অবস্থান নেয়া, দূতাবাসের কর্মকর্তাদের ব্যবহারসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে কথা বলেন শারমিন। তিনি জানান, শাজাহান নামের এক দালালের মাধ্যমে ২০১৬ সালের শেষের দিকে সৌদি যান। কিন্তু সৌদি শেখদের নির্যাতন সইতে না পেরে মাস দুই আগে ব্র্যাকের সহায়তায় দেশে ফিরেন আসেন।

শারমিন বলেন, ‘দালাল শাজাহান আমাকে মেডিকেলের ভিসার কথা বলে সৌদি পাঠায়। ওখানে যাওয়ার পর জানতে পারি বাসা-বাড়ির ভিসা। যদি ফিরে আসি তাহলে মানুষ খারাপ বলবে-এই চিন্তা করে ওই বাসাতে কাজ করতে থাকি। বাসাতে যমজ ৫টি বাচ্চা ছিল। তাদের বড় ভাই ছিল ৭ জন। সব মিলিয়ে তিন তলার বাড়িতে ১৫ জন মানুষ ছিল।

‘সারাদিন কষ্ট করে কাজ করতাম। কিন্তু ওরা আমাকে খেতে দিত না। খেতে দিত খেজুর আর রুটি। ওরা যখন খেত, তখন সেখান থেকে কিছুটা রুটি ছিড়ে আমাকে দিত। বাচ্চাদের গোছগাছ করা ও তিন তলা বাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে এভাবে খেজুর আর রুটি খেয়ে থাকতে খুব কষ্ট হতো। কিন্তু কিছুই করার ছিল না। তাই কাজ করে যেতা, বলেন শারমিন।

তিনি বলেন, ‘১৫ দিন কাজ করার পর প্রথমে বাংলাদেশে কথা বলতে দেয়। এরপর মাস শেষ হলে বেতনের টাকা দেয়। বাংলাদেশি টাকায় যার পরিমাণ ২০ হাজারের মতো। এরপর তিন মাস চলে গেলেও বেতন দিচ্ছিল না। তখন বেতন চাইলে, বাড়ির মালিক বলে- তোর তো দেশে মা ছাড়া কেউ নেই। এক মাসের যে বেতন দিয়েছি, তোর মাকি খেয়ে ফেলেছে? এরপর বেতনের জন্য চাপাচাপি করলে আমাকে ঘরের মধ্যে বন্ধ করে রেখে ওরা সবাই বাইরে চলে যেত।তারপরে কি বেতনের টাকা দিয়েছে? জানতে চাইলে শারমিন বলেন, ‘বেতনের টাকা দিয়েছে কিন্তু নানাভাবে নির্যাতন করেছে। আমাকে কোনো নতুন কাপড় পরতে দিত না। ম্যাডামের ছেড়া কাপড় সেলাই করে আমাকে দিত। সাবান-তেল ব্যবহার করতে দিত না। ভিমবার দিয়ে গা-হাত-পা পরিষ্কার করতে বলত। এরপরও কাজ করছিলাম। কিন্তু শেষ দিকে এসে আমার ৬ মাসের বেতন আটকে দেয় এবং খাওয়া বন্ধ করে দেয়।একদিন আমাকে বাড়িতে রেখে ওরা সবাই বাইরে চলে যায়। বলে যায় একদিন পরেই চলে আসবে। কিন্তু এক সপ্তাহ চল গেলেও কেউ আসে না। ফ্রিজে তালা মারা। ফলে কিছু না খেয়েই এক সপ্তাহ পার করি। ৮ দিনের মাথায় মালিকের বড় ছেলে বাসায় আসে। সে টেবিলের ওপর বাসার চাবি রাখে। এরপর সেই চাবি দিয়ে বাসা খুলে পালিয়ে আসি। না খেয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে অনেক কষ্ট হচ্ছিল। তারপরও প্রায় এক কিলোমিটার রাস্তা হেঁটে আসি। পথের মধ্যে পাকিস্তানের এক ট্যাক্সি চালকের সঙ্গে কথা হয়। সে আমার সব কথা শুনে বাংলাদেশ অ্যাম্বাসিতে নিয়ে যায়, বলেন শারমিন।তিনি বলেন, ‘অ্যাম্বাসি থেকে আমাকে সেফহোম নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে গিয়ে আমি আবাক। আমার মতো অসংখ্য মানুষ। একটি ঘরের মধ্যে সবাই গাদাগাদি করে থাকছে। তার মধ্যেই থাকলাম। চারদিন পর মাকে ফোন করি। মা দালালকে বিষয়টি জানালে, ওই দালাল বাড়ির মালিককে ফোন করে জানিয়ে দেয়। এরপর আমার মালিক সেফহোম এসে অভিযোগ করে আমি ৪টি মোবাইল চুরি করে নিয়ে এসেছি। কিন্তু সেফহোমের স্যাররা তার প্রমাণ না পাওয়ায় মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেয়নি।

শারমিন বলেন, ‘শেখদের নির্যাতনে পালিয়ে সেফহোমে আশ্রয় নিলেও নির্যাতন বন্ধ হয়নি। সেফহোমে কোনো রকমে লবণ-হলুদ দিয়ে রান্না করে খেতে দিত। এ নিয়ে কেউ কোনো কথা বললে দূতাবাসের স্যাররা অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করত। আর বলত- তোরা দেশে খারাপ কাজ করে এখানে আসছিস। আবার এখানে এসে বেডাগোর লগে এডি করে, এখন আমাদের জ্বালাস। তোদের থাকতে দিছি থাকবি, না থাকতে চাইলে গেট খুলে দিচ্ছি তোরা যা গা। বাইরে গিয়া মরলে কোনো রকমে তোদের লাশ এসে দেশে পাঠিয়ে দেব।তিনি বলেন, ‘সৌদি মালিকদের কাছে অত্যাচারের শিকার হয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসে আসি সাহায্যের জন্য। কিন্তু উল্টো দূতাবাসের স্যাররা আমাদের ওপর অত্যাচার করা শুরু করে। বাথরুমে পানি না থাকলে স্যারদের জানালে বলে- পানি লাগব না, ওইভাবেই থাক। নানাভাবে এমন মানসিক নির্যাতন করত। কোনো মেয়ে চিল্লাচিল্লি করলে তাকে মানসিক ইনজেকশন দিয়ে দেয়া হত। শতশত মেয়েদের এভাবে নির্যাতন করা হচ্ছে। দূতাবাসের বড় স্যারের নির্দেশে এসব করা হয়।’

দেশে ফিরে আসলেন কিভাবে? এমন প্রশ্ন করা হলে শারমিন বলেন, ‘সেফহোমের মেয়েদের কাছ থেকে ব্র্যাকের নয়ন ভাইয়ের নম্বর পাই। এরপর মোবাইলে নয়ন ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলে দেশে ফিরিয়ে আসার ব্যবস্থা করে। দেশে আসার পর ব্র্যাক আমাকে ১ লাখ টাকা দিতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি টাকা না নিয়ে একটা চাকরি দেয়ার কথা বলেছি। তাতে ওরা রাজি হয়েছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ঈদের পর চাকরি দেবে বলে জানিয়েছে।‘