চট্টগ্রামে হেপাটাইটিস-ই আতঙ্ক

জে.জাহেদ,চট্টগ্রাম ব্যুরো | শুক্রবার, জুন ২৯, ২০১৮
চট্টগ্রামে হেপাটাইটিস-ই আতঙ্ক
চট্টগ্রাম মহানগরীর হালিশহর ও আশপাশের এলাকায় পানিবাহিত রোগের পাশাপাশি হেপাটাইটিস-ই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল থেকে তথ্য নিয়ে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন বৃহস্পতিবার (২৮ জুন) বেলা ১টা পর্যন্ত ২১৮ জন জন্ডিস আক্রান্তের খবর পাওয়া গেছে বলে জানান। এই ভাইরাসের প্রকোপে চট্টগ্রাম জুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

জানা গেছে, গত তিন মাসে পাঁচ শতাধিক মানুষ পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়েছে। মারা গেছে অন্তত ১০ জন। তবে সরকারিভাবে তিনজনের মৃত্যুর কথা জানা গেছে এবং এ ব্যাপারে তথ্য পেতে তদন্ত কমিটি কাজ করছে।

সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী ওই এলাকায় প্রশাসনকে শিগগরই পানির সমস্যা সমাধানের তাগিদ দেন। অন্যথায় এ সমস্যা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নাগালের বাইরে চলে যাবে বলে আশঙ্কা করেন তিনি।

আজিজুর রহমান বলেন, ‘কিছুদিন আগে সরকারি হিসাবে ১৭৮ জন জন্ডিস আক্রান্ত রোগীর তথ্য পাই। বুধবার প্রতিটি হাসপাতালে জন্ডিস আক্রান্ত রোগীর তথ্য চাইলে বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত ২১৮ জন রোগীর তথ্য বিভিন্ন হাসপাতাল দিয়েছে।’ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এসব রোগীকে আলাদাভাবে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে বলে জানান তিনি।

বৃহত্তর হালিশহরে পানির সমস্যা সমাধানে জরুরি ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে সিভিল সার্জন বলেন,  নগরের আগ্রাবাদেও ১২ জন জন্ডিসে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তারা পপুলার হাসপাতাল, সিএসিসিআর ও ম্যাক্স হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে।

হালিশহর ও আশপাশের এলাকায় পানিবাহিত রোগের পাশাপাশি হেপাটাইটিস-ই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে। গত তিন মাসে পাঁচ শতাধিক মানুষ পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়েছে। মারা গেছে অন্তত দশজন। তবে সরকারিভাবে তিনজনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করা হয়েছে। আতঙ্কিত স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই ফিল্টার পানি ও বোতলজাত বিশুদ্ধ পানি কিনে পান করছেন।

সিভিল সার্জন বলেন, ‘চট্টগ্রামে অন্যান্য পানিবাহিত রোগের সঙ্গে হেপাটাইটিস-ই সংক্রমণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ঢাকা থেকে আসা টিম এবং এখানকার প্যাথলজিকাল সেন্টারে হালিশহর এলাকার যত রক্তের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে সেখানে প্রায় সব কটিতে হেপাটাইটিস-ই পাওয়া গেছে।’

গত মার্চ মাসের শুরুতে হালিশহরে পানিবাহিত রোগে তিন শতাধিক মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল। রমজান মাসে কয়েকজনের মৃত্যু হলেও স্বাভাবিক বিবেচনায় তা আলোচনায় আসেনি। কিন্তু গত কয়েক দিন ধরে আবার ওই এলাকায় হেপাটাইটিস-ই, টাইফয়েড, জন্ডিস ও ডায়রিয়ার মতো বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে অনেকে আক্রান্ত হচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

এরই মধ্যে ইয়াসির আরাফাত (২৮), শাহেদা মিলি (৪০) ও আশিকুল রিসাত (১৮) নামের তিনজনের মৃত্যুর খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় আতঙ্ক দেখা দেয়।

স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, ‘মাস কয়েক আগে চট্টগ্রামের সিডিএ আবাসিক এলাকা এবং হালিশহর হাউজিং এস্টেটের বিভিন্ন এলাকা থেকে মোট ১১ জনের হেপাটাইটিস-ই পরীক্ষা করার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয় এবং সব কটিতে হেপাটাইটিস-ই ধরা পড়ে। এরপর ওই এলাকার ওয়াসার পানি পরীক্ষা করে সেখানেও হেপাটাইটিস-ই ভাইরাসের জীবাণু ধরা পড়ে।’

এক গৃহবধূ বলেন, হেপাটাইটিস-ই এখন হালিশহরে আতঙ্কের নাম। একদিকে জলাবদ্ধতা অন্যদিকে ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়ি ও পানির লাইন লিকেজ হয়ে ময়লা-আবর্জনা প্রবেশ করায় এলাকায় এ রোগ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

এদিকে পানিবাহিত রোগের প্রকোপ দেখা দেয়ার কারণ অনুসন্ধানে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) স্বাস্থ্য বিভাগের তিন সদস্যের একটি দল মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেছে। মঙ্গলবার সকাল থেকে একজন চিকিৎসকের নেতৃত্বে দুজন স্বাস্থ্যকর্মী তদন্ত কাজ শুরু করেন।

গত সোমবার ওই এলাকার অন্তত ২৫টি বাসা থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করার পর মঙ্গলবার আরও পাঁচটি বাসা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার উদ্যোগ নেয় চট্টগ্রাম ওয়াসা।

হালিশহরের এ, বি, আই, কে ও এইচ ব্লকের বিভিন্ন বাসার ওয়াসার রিজার্ভ পানি ও লাইনের পানির নমুনা নিয়ে যান ওয়াসার কর্মীরা। পানির নমুনা পরীক্ষার ফলাফল ৪৮ ঘণ্টা পর জানানো হবে বলে জানান ওয়াসার গবেষকরা।

তবে এর আগে বিভিন্ন স্থান থেকে নেয়া নমুনায় কোনো জীবাণু পাওয়া যায়নি বলে জানান  চট্টগ্রাম ওয়াসার ক্যামিস্ট মিলন চক্রবর্তী। তিনি বলেন, ‘জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া একজনের বাসায়ও গিয়েছি আমরা। ওই বাসায় ওয়াসার সংযোগ নেই এবং সাম্প্রতিক সময়ে বৃষ্টির পানি ব্যবহার করে আসছিল পরিবারটি।’

চট্টগ্রাম ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী আজিজুর রহমান বলেন, ‘ওয়াসার পানির মাধ্যমে কোথাও ভাইরাস ছড়ায়নি বলে আমার ধারণা। তারপরও আমরা এসব নমুনা গুরুত্বের সঙ্গে আমাদের ল্যাবে পরীক্ষা করব।’ যারা বাসায় রিজার্ভ ট্যাংকে ওয়াসার পানি জমান, জলাবদ্ধতার কারণে তাদের পানিতে জীবাণু প্রবেশ করতে পারে বলে তিনি ধারণা করেন।

এদিকে মঙ্গলবার (২৬ জুন) দুপুর একটায় হালিশহর বি ব্লকের দুই নম্বর রোডের ১৬ লাইনের ১৯ নম্বর বাসা থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করেন ওয়াসার প্রকৌশলী মো. মামুন। তিনি জানান, মঙ্গলবার পাঁচটি বাসা থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন তারা। ওই বাড়ির মালিক হাছিনা বেগম বলেন, বর্তমানে এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।

হালিশহরে তিনজনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে চসিকের একজন চিকিৎসকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের দল মঙ্গলবার থেকে কাজ করছে বলে জানান চসিকের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আলী। তারা মৃত তিনজনের আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করছেন।

পানিবাহিত রোগ থেকে বাঁচতে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন কার্যালয় জরুরি ভিত্তিতে ১০টি নির্দেশনা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- বিশুদ্ধ পানি পান ও ব্যবহার নিশ্চিত করা; পানি ৩০ মিনিট ফুটিয়ে ফিটকিরি ব্যবহার করে অথবা পাঁচ লিটার পানিতে একটি পানি বিশুদ্ধকরণ টেবলেট দিয়ে আধ ঘণ্টা থেকে ১২ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবহার করা; হোটেল বা দোকানের পানি খাওয়া বন্ধ করা; রাস্তায় খোলা জায়গার শরবত বা খাবার খাওয়া বন্ধ করা; এলাকায় কারও চোখ হলুদ হলে, ডায়রিয়া হলে বা তিন দিনের বেশি জ্বর থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া; হালিশহর বিডিআর মাঠ থেকে বিশুদ্ধকরণ টেবলেট সংগ্রহ করা।

অন্য নির্দেশনাগুলো হলো- গর্ভবতী নারীর চোখ হলুদ হলে স্থানীয় হাসপাতালে যোগাযোগ করা; বাসার ছাদে বা পানির নিচে সংরক্ষিত পানির ট্যাংক চার মাস পর পর ব্লিচিং পাউডার দিয়ে পরিষ্কার করা; খাবারের আগে ও মলত্যাগের পরে হাত অন্তত ২০ সেকেন্ড সাবান দিয়ে পরিষ্কার করা; হাতের নখ ছোট রাখা; খালি পায়ে বাথরুমে না যাওয়া এবং বাথরুমে আলাদা জুতা ব্যবহার করা; বিশুদ্ধ পানি সংরক্ষণের পাত্রটির নিচের অংশ নিয়মিত পরিষ্কার করা এবং ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রাখা; পাতলা পায়খানা হলে ওরস্যালাইন ও ঘরের তৈরি চিনি ও লবণ মিশ্রিত শরবত বেশি বেশি পান করা।