ময়মনসিংহ শহরে অশিক্ষিত নার্স, হাতুড়ে টেকনিশিয়ান

নিজস্ব প্রতিবেদক | শনিবার, জুলাই ২৮, ২০১৮

ময়মনসিংহ শহরে অশিক্ষিত নার্স, হাতুড়ে টেকনিশিয়ান

অশিক্ষিত নার্স, হাতুড়ে হাতুড়ে টেকনিশিয়ানরাই চালাচ্ছে ময়মনসিংহ শহরের অধিকাংশ ডায়াগনোস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক। জেলা সিভিল সার্জনের পক্ষ থেকে সকল সরঞ্জাম ও লোকবল নিয়ে প্রতিষ্ঠান পরিচালানার নির্দেশ দিলেও তা উপেক্ষিত। ঐনির্দেশনা বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করেই চলছে রমরমা ব্যবসা। জানা গেছে, ময়মনসিংহ শহরে ২৮০টি ক্লিনিক ডায়াগনোস্টিক সেন্টারের মধ্যে ১১৩ টি অনুমোদন নিলেও বাকীগুলি অনুমতির আবেদন করে পরিচালিত হচ্ছে। এদের অধিকাংশই চলছে বাসা- বাড়িতে। অনুপযোগী পরিবেশে স্থাপিত এসব প্রতিষ্ঠানের সামনে সুপরিচিত ডাক্তার বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘ তালিকাযুক্ত বিরাট মাপের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয়া হলেও সরেজমিন গিয়ে তাদের কাউকে পাওয়া যায় না।

জানা যায়, রোগী আকর্ষণের জন্যই শুধু বিশেষজ্ঞদের নাম সাইনবোর্ডে লেখা হয় এবং নাম ব্যবহার বাবদ মাসিক ফি দেয়া হয় তাদের। সেসব ক্লিনিকে গিয়ে সাইনবোর্ডে লিপিবদ্ধ কাউকে পাওয়া যায়নি। বেশির ভাগ ডায়াগনোস্টিক সেন্টারে সরকারী অনুমোদনপ্রাপ্ত সার্টিফিকেটধারী দক্ষ টেকনিশিয়ান পর্যন্ত নেই। এইসব টেকনিশিয়ানরাই রিপোর্ট দিয়ে থাকে। তাদের কাছে সংরক্ষিত থাকে ডাক্তারদের সিল পেড। ডাক্তারদের স্বাক্ষর দেয় নিজেরাই। অভিযোগ রয়েছে, জেলার উপজেলাগুলির গ্রামাঞ্চলের গ্রাম্য চিকিৎসক এবং ব্র্যাকের স্বাস্থ্য কর্মীরা স্থানীয় ডাক্তারদের মাধ্যমে এসব ক্লিনিক ও ডায়গনোস্টিক সেন্টারে রোগী ভাগিয়ে আনে। এক্ষেত্রে তারা ১ হাজার টাকা থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত কমিশন পেয়ে থাকে।

বিক্রি হওয়া এসব রোগীর সিজার অপারেশন থেকে ৩ হাজার এবং পরীক্ষার জন্য ১ হাজার অথবা তদুর্ধ টাকা কমিশন পায় তারা। এখানকার ক্লিনিক ও ডায়গনোস্টিক সেন্টার মালিকদের টিকিট সিস্টেম। পুরনো যন্ত্রপাতি অর্থাৎ রিকন্ডিশন যন্ত্রপাতি দিয়ে চলছে এসব প্রতিষ্ঠানে নামকাওয়াস্তে চিকিৎসা। যন্ত্রপাতি ৮ থেকে ১২ বছরেরও অধিক পুরনো। কখনও হয়না সঠিক যন্ত্র দিয়ে পরীক্ষা। স্বল্প শিক্ষিত অশিক্ষিত নার্স। এসব নার্সের নেই কোন প্রশিক্ষনও। অভিযোগ রয়েছে, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রয়েছে এসব ক্লিনিক ও ডায়গনোস্টিক সেন্টার মালিকদের নিয়োজিত দালাল। এখান থেকে তারা কমিশন পায়। এই দালালদের তালিকায় রয়েছে ডাক্তারও। গত বছর র‌্যাবের অভিযানে পিউর ডায়াগনোস্টিক সেন্টারের জরিমানা ও শাহনাজ হাসপাতালের ভেতর কনডম, গাঁজা উদ্ধার করা হয়। ময়মনসিংহে র‌্যাব সদস্যের অভিযান প্রশংসিত হলেও ঘন ঘন অভিযান চালানোর দাবি উঠেছে। অভিযান না থাকার ফলে ময়মনসিংহ শহরে ক্লিনিক ও  অবৈধ ডায়াগনোস্টিক সেন্টারের ছড়াছড়ি।

অধিকাংশ সেন্টারে ভাড়া করে আনা হয় চিকিৎসক। এমন ফাঁদে পড়ে নানা হয়রানি শিকার হয়ে আসছে অনেক রোগী। সাইনবোর্ড সর্বস্ব এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়মনীতির বালাই নেই, হাতুড়ে টেকনিশিয়ান দ্বারাই চালানো হয় রোগ নির্ণয়ের যাবতীয় পরীক্ষা। তারা মনগড়া রিপোর্ট তৈরি করে ঠকাচ্ছে নিরীহ মানুষকে। একই রোগ পরীক্ষায় একেকটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে একেক রকম রিপোর্ট পাওয়ার অনেক ঘটনা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান রোগী মারার কারখানা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। এদের থেকে প্রাপ্ত রিপোর্ট নিয়ে রোগী ও তাদের স্বজনরা চরম বিভ্রান্তিতে পড়েন। নানা সমালোচনার মধ্যেও সরকারী হাসপাতালের একশ্রেণীর ডাক্তারদের সহায়তায় এসব ডায়াগনোস্টিক সেন্টার মালিকদের যথেচ্ছ টেস্টবাণিজ্য চলছে বছরের পর বছর। ডায়াগনোস্টিক প্রতারণার শিকার মানুষজন। বার বার অভিযোগ তুলেও প্রতিকার পাচ্ছেন না। প্রতিনিয়ত রক্ত মিশ্রিত ব্যান্ডেজ, মাংসের টুকরা, ব্যবহৃত সিরিঞ্জ ও অন্যান্য আবর্জনা ফেলা হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের আশপাশে, খোলাস্থানেই।

নিয়ম অনুযায়ী এগুলো ইনসিনেটরে পোড়ানোর কথা। এসব বর্জ্য থেকে সিরিঞ্জসহ অন্যান্য সরঞ্জাম ধুয়ে মুছে আবার ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে। ফলে বিভিন্ন রোগের সংক্রমণ ঘটছে। অপরদিকে এই বর্জ্য অপরিকল্পিতভাবে খোলা জায়গায় ফেলে রাখার কারণে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে মারাত্মকভাবে। ডাক্তাররা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সরবরাহকৃত সিøপে টিক মার্ক দিয়ে দেন কোন কোন টেস্ট করাতে হবে। রোগী তার পছন্দমতো ডায়াগনোস্টিক সেন্টারে সেই টেস্ট করালে ডাক্তার সে রিপোর্ট গ্রহণ করেন না। ডাক্তার তার নির্ধারিত সেন্টার থেকে আবার একই টেস্ট করিয়ে আনতে চাপ দেন। ওই সেন্টার তাকে কমিশন দেয়। কমিশন নিশ্চিত হলে পরেই চিকিৎসা।

পরীক্ষার ফি বাবদ ইচ্ছে মাফিক টাকা-পয়সা আদায় করা হচ্ছে। একই ধরনের প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার জন্য একেক প্রতিষ্ঠানে ধার্য আছে একেক ধরনের ফি। নিয়ম আছে রেট চার্ট স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠানের চোখে পড়ার মতো স্থানে লাগিয়ে রাখার। বিভিন্ন শ্রেণির ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে তমা প্রাইভেট হাসপাতালের পচিালক নুরুদ্দিনের মত রিকশাচালক পর্যন্ত ক্লিনিক ডায়াগনোস্টিক সেন্টারের মালিক বনে গেছেন। তাদের কাছে আধুনিক চিকিৎসাসেবার কোন গুরুত্ব নেই, আছে শুধু লাভের ফন্দিফিকির। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে ট্রেড লাইসেন্স, ভ্যাট, আয়কর দেয়া ছাড়াই।

ফাঁকি দেয়া হচ্ছে সরকারকে। বসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা পরিচালনার জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে সরকারী একটি রেট চার্ট দেয়া আছে। ক্লিনিক্যাল প্যাথলজির ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ৮০ ও সর্বোচ্চ ৬০০ টাকা, মাইক্রোবায়োলজি এ্যান্ড ইমিউনোলজিতে সর্বনিম্ন ১৫০ ও সর্বোচ্চ এক হাজার ৩০০ টাকা, বায়োকেমিস্ট্রিতে সর্বনিম্ন ১২০ টাকা ও সর্বোচ্চ ৮০০ টাকা, হিস্ট্রোপ্যাথলজিতে সর্বনিম্ন ৫০০ ও সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ টাকা, ড্রাগ এবিউজে সব ধরনের পরীক্ষা সাড়ে ৫০০ টাকা, থেরাপিউটিক ড্রাগের ক্ষেত্রে ৫০০ টাকা ও ভাইরোলজির ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ২০০ ও সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা ফি নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু ডায়াগনোস্টিক সেন্টারগুলোতে নির্ধারিত তালিকামূল্যের তুলনায় বহুগুনে বেশি ফি নেয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী রোগী ও তাদের অভিভাবকরা। ময়মনসিংহের সিভিল সার্জন ডা. একেএম আব্দুর রউফ জানান, ময়মনসিংহে যোগদানের পর থেকে পরিদর্শন শুরু করেছি। চরপাড়া পিউর ডায়াগনোস্টিক সেন্টারেও রিকন্ডিশন পুরনো যন্ত্রপাতি দেখা গেলে, সরঞ্জাম ও যথাযথ  লোকবল নিয়োগ নিয়ে করে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য মৌখিক নির্দেশ দিয়েছি। সরেজমিনে দেখা গেছে সিভিল সার্জনের ঐনির্দেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন এবং উপেক্ষা করেই চলছে এই প্রতিষ্ঠান।