স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক সংকট, রোগী দেখেন সহকারী

জাহিদুল হক মনির | মঙ্গলবার, জুলাই ৩১, ২০১৮
 স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক সংকট, রোগী দেখেন সহকারী

ঠান্ডা-জ্বর, শ্বাস-প্রশ্বাসে আক্রান্ত ৯ মাস বয়সী ছেলে আসাদ উজ্জামানকে দুই দিন ধরে পল্লী চিকিৎসককে দেখান বাবা মো. আমির হোসেন (৩২)। পরে পল্লী চিকিৎসকের পরামর্শে বড় ডাক্তার (এমবিবিএস) দেখাতে গত ২৯জুলাই দুপুরে ছেলেকে নিয়ে আসেন হাসপাতালে। পরে জরুরি বিভাগের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসকের সহকারীর (স্যাকমো) পরামর্শে তার ছেলেকে হাসপাতালে ভর্তি করান তিনি।

কিন্তু ২দিন হয়ে গেলেও উপসহকারী কমিউনিটি চিকিৎসা কর্মকর্তা (স্যাকমো) ছাড়া মেডিকেল অফিসারের (এমবিবিএস) দেখা মেলেনি।
উপজেলার ধনাশাইল গ্রাম থেকে আসা রেনু বেগম (৪০) বড় ডাক্তার (এমবিবিএস) দেখাইতে বহির্বিভাগের টিকিট কাটেন। কিন্তু টিকিটে মেডিকেল অফিসারের কক্ষ (১নম্বর) না লিখে উপসহারী কমিউনিটি চিকিৎসা কর্মকর্তাদের কক্ষ (৭নম্বর) লিখে দেওয়া হয়। পরে নিরুপায় হয়ে স্যাকমোর কাছ থেকে চিকিৎসাসেবা নিতে হল তার।

গত ৩০জুলাই সোমবার দুপুরে এ প্রতিবেদক শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরেজমিনে গেলে এ কথাগুলো রোগীর আত্মীয়-স্বজন ও রোগী নিজেই জানান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, হাসপাতালে চিকিৎসক সংকটের কারণে বহির্বিভাগ, আন্তঃবিভাগ ও জরুরী বিভাগ স্যাকমো দিয়েই চলছে।  আর যে কয়েকজন  কর্মরতকে রয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগ।

জানা গেছে, এ উপজেলায় প্রায় আড়াই লাখ মানুষের বাস। বর্তমানে ৩১ শয্যার এই হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ৩০০ এবং আন্তঃবিভাগে ২০জন রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। কিন্তু প্রয়োজনীয়সংখ্যক চিকিৎসকের অভাবে রোগীরা ভোগান্তিতে পড়েন। হাসপাতালে এসে রোগীদের দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। মাঝে মাঝে চিকিৎসক না পেয়ে ফিরে যেতে হয় অনেককে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, এ হাসপাতালে চিকিৎসকের ১৭টি পদের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ৫ জন কমর্রত আছেন। জুনিয়র কনসালট্যান্টের ৪টি পদের ৩টি, সহকারী সার্জনের ৬টির ৪টি শূন্য। এ ছাড়া মেডিসিন, আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তার (আরএমও) এবং অবেদনবিদের (অ্যানেসথেটিস্ট) তিনটি পদই শূন্য। মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাবঃ) ২টির ১টি, চিকিৎসা সহকারীর ৯টির মধ্যে ৫টি, সিনিয়র ষ্টাফ নার্সের ৯টির ৫টি, অফিস সহকারীর ৩টি পদের মধ্যে ২টি শূণ্য। এ্যাম্বুল্যান্স থাকলেও চালক না থাকায় ব্যবহারের অভাবে অকেজো হয়ে পড়ছে। জনবলসংকটের কারণে হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি দূর্গন্ধের সৃষ্টি হয়েছে।  হাসপাতালের মেডিকেল অফিসারদের কক্ষ, অস্ত্রোপচার কক্ষ, এক্সরে কক্ষটি বন্ধ। এ হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ সার্জন ও অ্যানেসথেসিস্টের অভাবে কোনো অস্ত্রোপচার হয় না। এক্সরে মেশিন বিকল হয়ে যাওয়ায় এক্সরেও হয় না। ফলে গরিব রোগীদের অতিরিক্ত টাকা খরচ করে প্রাইভেট ক্লিনিক অথবা জেলা সদর হাসপাতালে গিয়ে অস্ত্রোপচার করাতে হয়। চিকিৎসক সংকটের কারণে উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল কর্মকর্তারা হাসপাতালের বহির্বিভাগে রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছেন। তাদের কক্ষে রোগীদের উপচে পড়া ভিড়।
বহির্বিভাগের রোগী দেখার দায়িত্বে কমর্রত উপসহকারী কমিউনিটি চিকিৎসা কর্মকর্তা মো. আবুল হাশেম বলেন, রোগীর অবস্থা জটিল মনে হলে রোগীকে স্যারদের (মেডিক্যাল অফিসার) কাছে কাছে পাঠিয়ে দিয়ে থাকি। এভাবেই আমরা সেবা দিয়ে যাচ্ছি।

এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মোহাম্মদ আবু হাসান শাহীন বলেন, স্বল্পসংখ্যক চিকিৎসক ও চিকিৎসা সহকারীর সমন্বয়ে তারা রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। চিকিৎসক সংকটের বিষয়টি তিনি বিভাগীয় পরিচালকের সাথে দেখা করে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে অবহিত করেছেন।
 শেরপুরের সিভিল সার্জন ডাঃ মো. রেজাউল করিম বলেন, এসব সমস্যা সমাধানের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে অবহিত করা হয়েছে। আশা করা যায়, এসব সমস্যার দ্রুত সমাধান হয়ে যাবে।