পতিতাপল্লীতে মূর্তিমান আতংক টিএসআই আজিজ

শাহিনুর রহমান খান, ময়মনসিংহ | মঙ্গলবার, আগস্ট ৭, ২০১৮
পতিতাপল্লীতে মূর্তিমান আতংক টিএসআই আজিজ
ময়মনসিংহ কোতয়ালী মডেল থানার আওতাধীন ১নং পুলিশ ফাঁড়ির টিএসআই আব্দুল আজিজ শহরের রমেশ সেন রোডের যৌনপল্লী থেকে প্রতিমাসে মাসোহারা পান দেড় লক্ষাধিক টাকা ।

এই টাকার একটি অংশ থেকে বড় আকারের দেশি মুরগি কিনে তিনি পাঠান পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তার বাসায় ।  আরেক অংশের টাকায় তাজা তরিতরকারিসহ বাজার পাঠান জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তার বাসায় । ময়মনসিংহ প্রতিদিনের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এমন তথ্যই পাওয়া গেছে ।

এই যৌনপল্লীতে কর্মরত নারীরা যেখানে দুবেলা দুমুঠো মোটা ভাতের জন্য নিজের জীবন বিক্রি করে দিচ্ছেন । সেখানে তাদেরই জীবন বিক্রির উপার্যিত টাকার মাসোহারার টাকায় চলে পুলিশের চিকন চালের বাহারি খাবার ।

 এটি করে সংশ্লিষ্ট পুলিশে কর্মরত এই কর্মকর্তারা এক নির্লজ্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ।  ১নং পুলিশ ফাঁড়ির টিএসআই আব্দুল আজিজ যৌনপল্লীর প্রীতি বেশ দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
ময়মনসিংহ কোতয়ালী মডেল থানার আওতাধীন ১নং পুলিশ ফাঁড়ির টিএসআই আব্দুল আজিজের নানা অনিয়ম আর অপকর্মে যুক্ত তিনি ঘুরেফিরে ১নং পুলিশ ফাঁড়িতে থাকতে মরিয়া হয়ে আছেন দীর্ঘদিন থেকেই।

এই ফাঁড়িতেই তিনি ছিলেন কনস্টেবল, হাবিলদার আর এখন টিএসআই। ১নং পুলিশ ফাঁড়ি থেকে তার অন্যত্র বদলিতে অনিহা প্রকট আকার ধারণ করায় যৌরপল্লীসহ শহরের ঐফাঁড়ি এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

 এই ধারা অব্যাহত থাকলে শহরে অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যাবার আশংকা প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল।

এদিকে শহরবাসী সবার একটাই প্রশ্ন- এত অনিয়ম অপকর্মের পরও যিনি বহাল তবিয়তে, তার খুঁটির আসল জোরটা কোথায়? অভিযোগের তদন্ত নেই তার বিরুদ্ধে। রমেশসেন রোডের যৌনপল্লীসহ ১নং পুলিশ ফাঁড়ি এলাকাটা যেন তারই রাজ্যপাট।

 অবাধে চালিয়ে যাচ্ছেন যৌনপল্লীতে অপ্রাপ্তবয়সী নারী , কিশোরী ক্রয়- বিক্রয়, মাদক সংশ্লিষ্টতা এবং গ্রেপ্তার বাণিজ্য। নিয়মনীতির তোয়াক্কাই করেন না।

মওকা পেলে দুই হাতে লুটে নেন সব। আইন মানার বালাই নেই। তিনি যে আইনেরই লোক! কেউ তার অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেই পড়ে যান রোষানলে। টিএসআই আব্দুল আজিজের রাহুগ্রাস থেকে তখন আর কে বাঁচায় তাকে।

১নং পুলিশ ফাঁড়ির টিএসআই আব্দুল আজিজ শহরের ফাঁড়ি এলাকায় এক মূর্তিমান আতংকের নাম। কিন্তু শত অভিযোগের পরও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

ইতিপর্বৈ তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ প্রতিবাদ করলেও এই প্রতিবাদই যেন আশীর্বাদ হয়ে এসেছে টিএসআই আজিজের জন্য। তিনি দালালদের অভিবাবক বানিয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে কামিয়ে নিচ্ছেন বিপুল অংকের অর্থ। সাধারণ মানুষকে মিথ্যা অভিযোগ এনে মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে একদিকে যেমন অর্থ আদায় করছেন,

অন্যদিকে তারই প্রশ্রয়ে অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে পতিতাপল্লীসহ শহরের মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীরা। সম্প্রতি পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযানের পরও আব্দুল আজিজের আশীর্বাদপুষ্টরা পতিতাপল্লীসহ অনেক মাদক স্পটে জমজমাট ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। জানা গেছে, পতিতাপল্লীসহ সাহিদা বেগম নামের তার কথিত স্ত্রী রয়েছে বলে জানান, যৌনকর্মী ছদ্মনাম প্রিয়া। এখানকার মাসোহারা,

দৈনিক আয়, পতিতা ক্রয়- বিক্রয় হয় টিএসআই আব্দুল আজিজের মাধ্যমে। একটি সূত্র জানায়, জেলা পুলিশের একজন কর্মকর্তার মাধ্যমে তদবির করে ১নং পুলিশ ফাঁড়িতে দীর্ঘসময় ধরে ঢুকে আছেন তিনি।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তার দায়িত্বপালনকালে অসংখ্য মানুষকে গ্রেপ্তার করা হলেও সিংহভাগকেই ছেড়ে দিয়েছেন টিএসআই আব্দুল আজিজ, তবে সবই টাকার বিনিময়ে। মাদক ও যৌনপল্লীতে নারী কেলেংকারি মামলায় আসামি করার ভয় দেখিয়ে প্রকাশ্যেই কামিয়েছেন লাখ লাখ টাকা, টিএসআই আব্দুল আজিজের হস্তক্ষেপে ভালো নেই যৌনপল্লীর মেয়েরা।

আব্দুল আজিজ এখানকার অনেক কিশোরীকে সারাজীবনের জন্য অন্ধকার নরক বানিয়ে দিয়েছেন। তাদেরকে প্রতিনিয়ত শারীরিক ও মানষিক নির্যাতন করে যাচ্ছেন বলে জানান একাধিক যৌনকর্মী। যৌনকর্মীরাও নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, একমাত্র আব্দুল আজিজ যিনি আমাদের ভালো থাকার অন্তরায়। অনেক যৌনকর্মী অভিযোগ করেন,

এখানে বয়স, দেহের গঠন এবং আকর্ষণ অনুসারে আমরা একজন খদ্দেরের কাছ থেকে ২শ টাকা থেকে ৫শ টাকা পাই। এইটাকা থেকেও কমিশন দিতে হয় তাকে। নইলে আমাদের ওপর চলে পাষবিক নির্যাতন।

তিনি আইনের মারপ্যাচে ফেলে টাকা আদায় করে নেয়। আয় রোজগার না হলেও সুদব্যবসায়ীদের নিকট থেকে মোটা টাকার উচ্চসূদে টাকা নিয়েও পরিশোধ করতে বাধ্য হই। ময়মনসিংহ পতিতাপল্লীসহ নাবালিকা মেয়েদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।

 আঠার বছর বয়সের নিচে কোন মেয়ে যৌনপেশায় আসতে আইনী বাধা থাকলেও তাদের লাইসেন্স আনতেও কোনো অসুবিধায় পড়তে হয়না এখানকার বাড়ীওয়ালীদের সাথে আব্দুল আজিজের সখ্যতা থাকায়। এই টিএসআই সহযোগীতায় মোটা

অংকের টাকার বিনিময়ে দালালদের মাধ্যমে প্রায় শতাধিক নাবালিকা মেয়ে বিভিন্ন কৌশলে এখানে নিয়ে আসেন তারা। জোর করে আটকে রেখে তাদেরকে দেহ ব্যবসায় লিপ্ত হতে বাধ্য করছে। এদের আয়ের সিংহভাগ অর্থই টিএসআই আব্দুল আজিজ নেন।

তাদের কপালে জোটে দুবেলা খাবার, পরনের নোংরা কাপর, আর এখানে টিকিয়ে রাখতে বিভিন্ন প্রকার মাদকদ্রব্য।

আবার এরা শারীরিক সখ্যমতা হারিয়ে ফেললে টিএসআই আব্দুল আজিজ তাদেরকে যৌনপল্লী থেকে বেড় করে দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পতিতাপল্লী একজন নেত্রী জানান, কর্মীদের সামনে মহাবিপদ। ধীরে ধীরে এরা নেশার দিকে ঝুঁকছে।

তার বড় কারণ অপরাধ জগতের নেশাগ্রস্ত ছেলেরা এখানে এসে মেয়েদের সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করে ধীরে ধীরে মেয়েদেরকে নেশার দিকে টেনে নিচ্ছে। নানা অজুহাতে টিএসআইও টাকা নেয়।

নানাবিধ সমস্যা ঘিরে ধরেছে তাদেরকে। এ থেকে মুক্তির কোন পথও নেই বলে জানালেন যৌনকর্মীদের অপর একজন নেত্রী।

 নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ পুলিশের পলিসি মেকার কমিটির নিয়মানুযায়ী একই কর্মকর্তাকে এক থানা অথবা ফাঁড়িতে একাধিকার দায়িত্ব দেয়ার বিধান নেই। সেক্ষেত্রে

আব্দুল আজিজকে ঘিরে বিষয়টি নজর কেড়েছে সচেতন নাগরিকদের। দীর্ঘদিন ধরে ১নং পুলিশ ফাঁড়িতে তাকে দায়িত্বভার দেওয়ায় হতবাক হয়েছেন খোদ পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

অভিযোগ রয়েছে, চেয়ার ভাগিয়ে নিতে কর্মকর্তাদের চলে টাকা লেনদেনের প্রতিযোগিতা। ময়মনসিংহের ক্রাইম জোন হিসাবে পরিণিত ১নং পুলিশ ফাঁড়ি এলাকায় নাগরিক সেবা নিশ্চিতে অন্তরায় বলেও অভিমত আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকদের।

 তারা জানান, পতিতাপল্লী কিশোরী পাচার, মাদক বেচাকেনারমত স্পর্শকাতর ইস্যু যেখানে সারাবছরই লেগে থাকে। সেখানে তা বন্ধের পরিবর্তে এসব ইস্যুকে পুঁজি করে ফায়দা লুটতে চেয়ার দখলের প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত রয়েছেন এই টিএসআই।

তাই বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেতে প্রতিনিয়ত ব্যর্থ হচ্ছে কোতয়ালী মডেল থানা পুলিশ।

 আর এরমধ্যেই মুখ থুবড়ে পড়েছে ১নং পুলিশ ফাঁড়ির সেবাবান্ধব কর্মকান্ডও। মাদকবিরোধী অভিযানে যেখানে হিমশিম খাচ্ছে জেলা পুলিশ। এরমধ্যে বিতর্কিত এই পুলিশ কর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ ফাঁড়িতে দীর্ঘদিন ধরে পোস্টিং চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি।

সচেতন মহলের দাবি, টাকার বিনিময়ে টিএসআইয়ের চেয়ার বেচাকেনা অব্যাহত থাকায় নাজুক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

 এছাড়া টাকার দৌড়ে মেধাবী ও চৌকস কর্মকর্তারা ছিটকে পড়ায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সক্ষমতা হারাচ্ছে জেলা পুলিশ। সচেতন মহলের বক্তব্য, এই টিএসআই ১নং ফাঁড়ি পুলিশে প্রবেশ করে এখানের চেয়ার আর ছাড়তে নারাজ। একই এলাকায় দীর্ঘদিন চাকুরির সুবাদে নানা অনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েছেন তিনি। যেকারণে এই ফাঁড়ি এলাকার মানুষ কাঙ্খিত পুলিশি সেবা বঞ্চিত হচ্ছেন।

ইতিপূর্বেও এই কর্মকর্তা ১নং পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরত থাকাকালেও লুটপাট, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছিল তৎকালীন এটিএসআই আব্দুল আজিজের বিরুদ্ধে।

তাই আগামী সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সম্ভাবনার নতুন বিভাগ ময়মনসিংহ জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এসব বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তা কতটুকু সফল হবেন তা নিয়ে সন্দিহান সচেতন নাগরিকরা। এব্যাপারে আব্দুল আজিজের সাথে মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি পরে জানাবেন বলে জানান।