এত মানুষকে ট্রাফিক আইন মানাবে কে?

অপরাধ সংবাদ ডেস্ক | মঙ্গলবার, আগস্ট ১৪, ২০১৮
এত মানুষকে ট্রাফিক আইন মানাবে কে?

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিশু-কিশোরদের উত্তাল আন্দোলনের পর যারা আশা করেছিলেন ট্রাফিক আইন মানার প্রতি মানুষের ঝোঁক বাড়বে, তারা ছিলেন ভুল। আন্দোলনের পর বিশৃঙ্খল যান চলাচলের পাশাপাশি ফিরেছে বিশৃঙ্খলভাবে রাস্তা পারাপার।

বেশ দ্রুত গতিতে গাড়ি চলছে, এমন মধ্যেই ‘দে দৌড়’- এটাই যেন পছন্দ নগরবাসীর। গত ৩০ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত আন্দোলনে থাকা শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা স্কাউটের সদস্য তারা ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে ট্রাফিক সপ্তাহে কাজ করতে গিয়ে দেখছেন, কতটা কঠিন মানুষকে মানানো।

এই সপ্তাহ চলার মধ্যে ঢাকার পুলিশ কমিশনার সংবাদ সম্মেলন করে তার অসহায়ত্বের কথা জানিয়েছেন। বলেছেন, পথচারীদের ৯০ শতাংশই আইন মানে না।

কেবল রাস্তা পারাপার নয়, বাসে উঠার জন্য ফুটপাতের বদলে মূল রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা, যেখানে সেখানে লাফ দিয়ে নামা এক সাধারণ চিত্র এই নগরে।

এভাবে চলতে গিয়ে বা রাস্তা পারাপার হতে কত রক্ত ঝরে, সেই পরিসংখ্যান রীতিমতো আঁৎকে উঠার মতো। বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ সেন্টার বলছে, সড়কে যত মৃত্যু হয় তার শতকরা ৪২ শতাংশই হয় অনিরাপদভাবে রাস্তা পারাপারে।

এসব তথ্য গণমাধ্যমে আসছে না, এমনটি নয়। সংবাদপত্র, টেলিভিশন, অনলাইন গণমাধ্যম আর হাল আমলে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠো ফেসবুকেও লেখালেখি হচ্ছে হরদম। তবু নেই হুঁশ।

কিন্তু তাই বলে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে ঝাঁকুনির পরও আগের দশায় ফিরবে পরিস্থিতি, সেটা ভাবনার অতীত ছিল পুলিশের।

গত দুই দিন ধরে রাজধনীর মোহাম্মদপুর, শাহবাগ, জিগাতলাসহ বিভিন্ন এলাকায় যেখানে ফুটওভার ব্রিজ আছে, সেই এলাকাগুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, ওভার ব্রিজ ব্যবহার করেন পথচারীদের মধ্যে একেবারেই নগন্য সংখ্যন মানুষ। বাকি যারা রাস্তা অনিরাপদভাবে রাসআত পার হচ্ছেন যাদের মধ্যে যাদের সঙ্গেই কথা হয়েছে, সবাই তাদের সময়ের অভাবের কথা জানিয়েছেন। সময় বাঁচাতে জীবনের ঝুঁকিকেই শ্রেয় মনে করেছেন তারা। হাতে গোণা এক দুই জন আবার অন্য কিছুকে অযুহাত হিসেবে দাঁড় করাচ্ছেন।

রাজধানীর শ্যামলী ফুটওভার ব্রিজের নিচ দিয়ে রাস্তা পার হওয়ার পর ঢাকাটাইমসের সাথে কথা হয় ফাহিম আহমেদের। তিনি বিএফ শাহিন কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র।রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউতে শিক্ষার্থীদের অবস্থান ও আন্দোলনে বেশ সক্রিয় ভুমিকা রেখেছিল বিএফ শাহিন কলেজের শিক্ষার্থীরা।আন্দোলনে নেমে আবার আইন অমান্যের কারণ জানতে চাইলে ফাহিদ বলেন, ‘আমি সব সময় ব্রিজ দিয়েই পার হই। আজ শরীর খারাপ তাই নিচ দিয়ে আসলাম।’

অসুস্থতার অজুহাত দেখানো ফাহিম কিছুক্ষণ পর দৌড়ে বাসে উঠে চলে যান।

শ্যামলী ওভারব্রিজের নিচ দিয়ে দৌড় দিয়ে রাস্তা পার হওয়া ঢাকা কমার্স কলেজের ছাত্র জহির ও ছাত্রী তিশি বললেন সময়ের অভাব তাদের।

তিশি ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘স্রেফ সময় বাঁচাতেই নিচ দিয়ে পার হচ্ছি। আর কিছু না।'

ফুটওভার জ্রিজ ব্যবহার না করাটা দোষের মানছেন চাকরিজীবী ইমরুল হাসান। বলেন, ‘নিচ দিয়ে পার হওয়াটা ভুল হয়েছে। এরপর থেকে ওভারব্রীজ দিয়ে পার হব।’

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এর দুর্ঘটনা ও সড়ক নিরাপত্তা বিভাগের শিক্ষক শাহ নেওয়াজ হাসনাত ই রাব্বি মনে করেন, ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারের প্রতি জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। সচেতনতার অভাবেই অনেকে ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করছে না।

এ ক্ষেত্রে কী করা যেতে পারে?- এমন প্রশ্নে এই শিক্ষক বলেন, ‘মানুষের ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করার কিছু কারণ আছে। এরমধ্যে একটি কারণ হচ্ছে ওভার ব্রিজের নিচ দিয়ে রাস্তা পারাপারের ব্যবস্থা থাকা। নিচ দিয়ে রাস্তা পারাপার যাতে না হওয়া যায়, এ দিকটা নিশ্চিত করতে হবে।'

‘আরেকটা বিষয় হচ্ছে, ব্রিজের ডিজাইন। বিশ্বের অনেক দেশে ফুটওভার ব্রিজের সিড়িতে (ল্যান্ডিং) দুই বার থামার জায়গা আছে। আমাদের দেশে তা একবার। এতে অনেকেই ক্লান্ত হয়ে পরেন। এই ডিজাইনটা পাল্টাতে হবে।’

তবে এই বিশেষজ্ঞ যেই দুটি বিষয়ের কথা বলেছেন, সেসব শর্ত যেসব এলাকায় পূরণ হয়, সেখানেও দেখা গেছে একই প্রবণতা। সড়ক বিভাজকে বেশ উঁচু বিভাজক বা স্টিলের বেড়া থাকলেও বেড়া গলে বা নিচ দিয়ে বা বিভাজক টপকে রাস্তা পার হওয়ার দৃশ্য দেখা যায় হরহামেশা। আবার বিমানবন্দর সড়কে চলন্ত সিঁড়িও টানতে পারছে না পথচারীদের। এর মধ্যেই তারা হেঁটে দ্রুত গতির গাড়ির ফাঁক গলেই দৌড়াদৌড়ি করেন। 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সমস্যার একটি সমাধান বের করেছেন। তিনি শৈশব থেকে মানুষের মনে গেঁথে দিতে চান রাস্তা পারাপারের নিয়ম। এ জন্য স্কুলের পাঠ্যবইয়েই বিষয়টির অন্তর্ভুক্তির নির্দেশ আছে তার। কিন্তু আগামী বছরের পাঠ্যবইয়ে এটি সংযোজন করা যাচ্ছে না সময়ের অভাবে। নতুন বই আসতে আসতেও ২০২০ সাল।

বুয়েটের দুর্ঘটনা ও সড়ক নিরাপত্তা বিভাগের শিক্ষক শাহ নেওয়াজ হাসনাত ই রাব্বি ট্রাফিক আইন মানতে শিশুদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যবরী হাতিয়ার হবে বলে মনে করেন। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের অনেক দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সেফটি পার্ক নামে এক ধরনের পার্ক থাকে। সেখানেই শিশুদের ট্রাফিক নিয়ম ও রাস্তা পারাপারের ব্যবহারিক কৌশলগুলো শেখানো হয়। আমাদের দেশেও এধরনের সেফটি পার্ক প্রয়োজন।’