শিশু রিয়াদ হত্যার প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা ‘বাবা রে আমারে মাইরা ফেলেন তবু একটু পানি দেন’

গফরগাঁও প্রতিনিধি | সোমবার, সেপ্টেম্বর ৩, ২০১৮
শিশু রিয়াদ হত্যার প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা
‘বাবা রে আমারে মাইরা ফেলেন তবু একটু পানি দেন’
গফরগাঁওয়ে চুরির অপবাদ দিয়ে অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া শিশু রিয়াদকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যার প্রত্যক্ষদর্শী শিশুদের চোখে-মুখে এখনো আতঙ্ক। তাদের চোখের সামনেই পেশাচিক নির্যাতনের শিকার রিয়াদ ‘বাবা রে আমারে একটু পানি দেন’ কাকুতি করতে করতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এই দৃশ্য এখন তাদের তাড়া করে বেড়ায়।

তাদের ভাষ্য, কয়েকজন মিলে যখন রিয়াদকে নির্যাতন করছিল, তখন সে তাদের কাছে মিনতি করেছিল যেন জমিতে ফেলে দেয় তাকে, যাতে সে ময়লা পানিতে একটু ঠোঁট ছোঁয়াতে পারে। কিন্তু পাষ-রা তাকে পেটাতে পেটাতে নিস্তেজ করে দেয়।

এই প্রতিবেদক রবিবার প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে যখন কথা বলে, তখন তাদের বর্ণনায় রিয়াদ হত্যার এক বীভৎস নির্যাতনের চিত্র উঠে আসে। ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী শিশুরা মাঝে মাঝেই আঁতকে উঠছিল।

গত বৃহস্পতিবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সকালে ঘাগড়া টাওয়ারের মোড় বাজারের কাছে দেড় ঘণ্টা ধরে পিটিয়ে  হত্যা করে পাষ-রা। এর প্রত্যক্ষদর্শী তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র ইয়াছিন, পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র শাকিবুল, নিহতের ছোট ভাই পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র রিফাত, ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র ফাহাদ, নাসিমা (৫০), ফালানী খাতুন (৬০), আহাদ মিয়া (৫২), কাঁচামাল ব্যবসায়ী জাকির (৪০)।

ঘটনার চার দিন পরও এসব প্রত্যক্ষদর্শী শিশু, নারী-পুরুষদের চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ। চোখের সামনে ভাই হত্যার দৃশ্য বাকরুদ্ধ করে রেখেছে ছোট ভাই শিশু রিফাত, শিশু ইয়াছিন ও শাকিলকে। অন্য প্রত্যক্ষদর্শীদের চোখেও প্রত্যক্ষদর্শী শিশুদের মতো দিশেহারা ভাব।

গত বৃহস্পতিবার ঘটনার সময় রিয়াদের বাকপ্রতিবন্ধী মা বাড়িতে ছিলেন না। বাবার বাড়ি থেকে তাকে ফোন করে আনা হয়। ঘটনাস্থলে পৌঁছেই তিনি জানতে পারেন তার সহজ-সরল ছেলেটাকে হত্যা করা হয়েছে। এ সময় মায়ের গগণবিদারী কান্না ও ভাই-বোনের চিৎকারে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।

প্রত্যক্ষদর্শী ছিপান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র শাকিবুল জানায়, সে ভোরে ঘুম থেকে উঠে পাকা তাল সংগ্রহের জন্য বাড়ি থেকে বের হয়। ঘাগড়া টাওয়ারের মোড় বাজারের কাছে গিয়ে রিয়াদের চিৎকার শুনে এগিয়ে যায়। সেখানে শুনতে পায়, একজন বলছে ‘এক ঘণ্টা হয়ে গেছে এখনো পা ভাঙতে পারলে না!’ তখন রাশিদ পেটাতে শুরু করেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে সোহেল নামে আরেকজন পেটানোয় অংশ নেয়। দুজন মিলে পেটাতে থাকে রিয়াদকে।

শাকিবুল বলে, ‘পরে রিয়াদ পানি পানি করে চিৎকার করছিল। তখন কেউ পানি না দেয়ায় রিয়াদ আবার চিৎকার করে কাকুতি করছি ‘আমারে ক্ষেতে ফেলে দেন। একটু পানি খাই।’ এভাবে বারবার মিনতি করতে করতে রিয়াদ নিস্তেজ হয়ে পড়লে নির্যাতনকারীরা তাকে কাঠের মাচাতে করে পাশের একটি পতিত জমিতে ফেলে দেয়।’

স্থানীয় উথুরী নি¤œমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র ফাহাদের ভাষ্য, ‘ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি রিয়াদ পানির জন্য কাকুতি মিনতি করছে। তখনো তার ওপর নির্যাতন চলছে। এ অবস্থা দেখে আমি ভয় পেয়ে সেখান থেকে বাড়ি চলে আসি।’  

নিহত রিয়াদের ছোট ভাই প্রত্যক্ষদর্শী রিফাত জানায়, তার চোখের সামনে ভাইকে পিটিয়ে হত্যা করেছে লোকগুলো। রিয়াদ বাঁচার জন্য আকুতি করলেও কেউ এগিয়ে যায়নি।

জীবনে এমন নিষ্ঠুর, নির্মম, পৈশাচিকতা আর কখনো দেখেননি আরেক প্রত্যক্ষদর্শী ফালানী খাতুন। তিনি বলেন, “রিয়াদকে যখন বেদম মারধর করা হচ্ছিল, একপর্যায়ে সে নির্যাতনকারীদের বলতে থাকে ‘ও বাবা রে আমারে আপনেরা মাইরা ফেলেন, তবু আমারে একটু পানি দেন।’ আমি পানি নিয়ে এগিয়ে গেলে নির্যাতনকারীরা আমাকে মারতে উদ্যত হয়। তারপরও ছেলেটাকে পানি খাওয়াতে অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু পারিনি। ওদের কাছে জান ভিক্ষা চেয়েও তাকে বাঁচতে পারেনি।’ বলতে বলতে জলে ভরে ওঠে ফেলানীর চোখ।

রবিবার দুপুরে রিয়াদের বাড়িতে ও ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের খুজে বের করে হত্যার বর্ণনা শোনার সময় প্রত্যক্ষদর্শী সবাই ছিল অশ্রুসিক্ত। আর মুখাবয়ব জুড়ে আতঙ্ক, বিশেষ করে প্রত্যক্ষদর্শী শিশুরা ছিল বেশি আতঙ্কিত।

রিয়াদের পরিবারে চলছে আহাজারি। প্রতিবন্ধী মা মাবিয়া আক্তার কখনো ছেলের অষ্টম শ্রেণির বই দেখিয়ে, কখনো ছেলের ব্যবহৃত সাইকেল, আবার কখনো খেলার জিনিসপত্র ও কাপড় চোপড় বুকে জড়িয়ে আহাজারি করছেন। প্রতিবেশী কয়েকজন নারী তাকে সান্ত¦না দেয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। উল্টো তাদের চোখ ভিজে ওঠে মায়ের কান্নায়।

এদিকে রবিবার শিশু রিয়াদ হত্যার ঘটনাস্থল গফরগাঁও ইউনিয়নের ঘাগড়া টাওয়ার মোড় বাজারে গিয়ে দেখা যায় নিস্তব্ধ সুনসান নীরব চারপাশ। সব দোকানপাট বন্ধ। হত্যাকা-ের পর কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলেনি। সারা গ্রামে শোকের আবহ।

এই বাজারেই খুন হয় রিয়াদ। ভোর পাঁচটা থেকে নির্যাতন চলে দেড় ঘণ্টার বেশি। সকাল সাতটার দিকে তার মৃত্যুর নিশ্চিত হওয়ার পরই কেবল ক্ষান্ত দেয় নির্যাতনকারীরা।  ঘাগড়া-উথুরী-ছিপান উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র রিয়াদ উথুরী গ্রামের সৌদি প্রবাসী সাইদুর রহমান শাহীনের ছেলে।

রিয়াদকে খুনের পরপর এলাকা ছেড়ে গা ঢাকা দেয় অপরাধীরা। বৃহস্পতিবার রাতে রিয়াদের ফুফা আব্দুর রাজ্জাক ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়জনকে আসামি করে গফরগাঁও থানায় মামলা করেন। কিন্তু এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

রিয়াদ হত্যার আসামিদের গ্রেপ্তার ও ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন করেছে রিয়াদের সহপাঠী, শিক্ষক, পরিবারের লোকজন ও এলাকাবাসী।

তার কলেজ পড়–য়া বোন নীলফুল নাহার শান্তা বলেন, ‘নির্যাতনকারীদের কাছে গিয়ে প্রাণভিক্ষা চাইলেও তারা নির্যাতন বন্ধ করেনি। এদের সবার হাতে ছিল দা-লাঠি। যারা আমার ভাইকে হত্যা করেছে তাদের দৃষ্টান্তমূল শাস্তিÍ চাই।’

আসামিদের গ্রেপ্তারে র‌্যাব ও পুলিশের যৌথ অভিযান চলছে বলে জানান গফরগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল আহাদ খান।