ভাবমূর্তি উদ্ধারের চেষ্টায় ছাত্রলীগ

অপরাধ সংবাদ ডেস্ক | রবিবার, সেপ্টেম্বর ৯, ২০১৮
ভাবমূর্তি উদ্ধারের চেষ্টায় ছাত্রলীগ

গত সাড়ে নয় বছরে নেতিবাচক সংবাদের শিরোনাম কম হয়নি ছাত্রলীগকে নিয়ে। তবে ইদানীং ছাত্র সংগঠনটির নেতা-কর্মীদের নিয়ে প্রায়ই এমন সংবাদ প্রকাশ হচ্ছে যাতে ঝরছে প্রশংসা।

ঈদে বাড়ি ফেরা মানুষের যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে স্বেচ্ছাসেবীর ভূমিকা, পথচারীদের নিরাপদ পারাপার নিশ্চিত করতে উদ্যোগ, কোরবানির পশুর বর্জ্য পরিচ্ছন্ন করা, দুর্ঘটনা কবলিতকে উদ্ধার, পথশিশুদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কাজে সম্পৃক্ত হচ্ছেন তারা।

এর মধ্যে কিছু সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগতভাবে এসেছে, কিছু সিদ্ধান্ত এসেছে সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে। সংগঠনের নেতা-কর্মীরা বলছেন, অতীতে নানা ঘটনায় তাদের যে দুর্নাম হয়েছে, সেটা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে সংগঠনের অতীতের গৌরব ফিরিয়ে আনতে চান তারা।

চলতি বছরের পহেলা আগস্টে রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে সভাপতি ও গোলাম রাব্বানীকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রলীগের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে পাল্টাতে থাকে ছাত্রসংগঠনটির কর্মকাণ্ড। কেন্দ্রীয় কমিটির আদেশে বিভিন্ন সেবামূলক কাজে দেখা যায় সংগঠনটির নেতাকর্মীদের।

মে মাসের শেষে সংগঠনের জাতীয় সম্মেলনের আগেই অবশ্য আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নতুন মডেলে ছাত্রলীগ গড়ার ঘোষণা এসেছিল। এই ‘নতুন মডেল’ কেমন হবে, সেই ব্যাখ্যা অবশ্য দেয়া হয়নি, তবে নতুন কমিটিকে ঘিরে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো বিতর্ক উঠেনি।

গত ১১ আগস্ট কক্সবাজার শহরে রাস্তা পারাপারের স্থান নির্দিষ্ট করে দিয়ে ১১টি স্থানে জেব্রা ক্রসিং তৈরি করে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা।

২২ আগস্ট ঈদুল আযহার আগে বাড়ি ফেরা মানুষের স্রোত সামলাতে পুরান ঢাকায় লঞ্চ টার্মিনাল সদরঘাট এলাকায় যান চলাচলে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে মাঠে নামেন কয়েকশ ছাত্রলীগ নেতা-কর্মী। এতে সদরঘাটগামী মানুষরা নির্বিঘ্নে যেতে পেরেছে টার্মিনালে।

ঈদের দিন কক্সবাজারে ছাত্রলীগের ভূমিকার প্রশংসা ঝরেছে সব মহলেই। সেদিন নগরীর কোরবানির বর্জ্য দল বেঁধে অপসারণ করেছেন ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। তাদের কারণেই নগরী পুঁতিগন্ধময় পরিবেশ থেকে রক্ষা পেয়েছে।


ঈদের পরদিন রাজধানীর দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকাতেও একই কাজ করেছেন ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। ঢাকা দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জুবায়ের আহমেদ এর নেতৃত্ব দেন।

২৪ আগস্ট কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে ভ্রমণে আসা হাজারো পর্যটকদের বিভিন্ন পয়েন্টে গোলাপ ফুল দিয়ে বরণ করে ছাত্রলীগ।

কক্সবাজার জেলা শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছাত্রনেতা মোরশেদ হোসাইন তানিমের নেতৃতে এ কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও কক্সবাজার পৌর মেয়র মুজিবুর রহমান।

এর আগে ২১ আগস্ট সিলেট মহানগর ছাত্রলীগ নেতা সাইদুল হক সা্ঈদ নগরীর রিকাবীবাজার এলাকায় এক গরু ব্যবসায়ীর ৮৪ হাজার টাকা কুড়িয়ে পেয়ে মালিকের কাছে তা ফিরিয়ে দেন। আর মালিককে খুঁজে বের করতে তার নিজের পকেট থেকে খরচ করতে হয় অর্থ।

সুনামগঞ্জের আবদুল গণি গরু বিক্রি করে তার টাকা হারিয়ে ফেলেন। আর ছাত্রলীগ নেতার পক্ষ থেকে করা মাইকিং শুনে তিনি প্রমাণসহ ছাত্রলীগ নেতার কাছে যান, ফিরে পান তার হারানো অর্থ।

১৩ আগস্ট নিজের জীবনের ঝুঁকি উপেক্ষা কর্ণফুলী নদীতে ডুবে যাওয়া ৯ ছাত্রীকে উদ্ধার করেন রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এ আর লিমন।

সেদিন বিকালে কর্ণফুলী নুরুল হুদা কাদেরী উচ্চ বিদ্যালয়ে ছুটির পর নদীর পেরিয়ে উজানছড়িতে বাড়ি ফিরছিল শিক্ষার্থীরা। কিন্তু মাঝপথে উল্টে যায় নৌকা।

আর এই দৃশ্য দেখে ছাত্রলীগ নেতা লিমন নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে ছাত্রীদের উদ্ধার করেন।

আগস্টের শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচার থিয়েটার ভবনের সামনে স্পিডব্রেকার রং করে দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের চার নেতা। নিজের টিউশনির টাকায় এই কাজ করেন তারা।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সদ্য বিদায়ী সহসম্পাদক রুদ্র রাইয়ান খান, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল ছাত্রলীগের সদ্য সাবেক সাহিত্য বিষয়ক সম্পাদক সাইমন সানি, এস এম হল ছাত্রলীগের রাফসান খান ফারিজ এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মিঠুন বাড়ৈ এই উদ্যোগ নেন।

জানতে চাইলে ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চোধুরী (শোভন) ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু তার কর্মের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে যেভাবে স্থান করে নিয়েছেন, ঠিক তেমনি তার হাতে গড়া ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরাও তাদের সেবামূলক কর্মের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকতে চান আজীবন। গড়তে চান জাতির জনকের স্বপ্নের সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ।’

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে শোভন বলেন, ‘আমাদের এই কার্যক্রম দিন-দিন আরও প্রসারিত হবে। কারণ আমরা পরিচ্ছন্ন ও উন্নত বাংলাদেশ গড়তে বদ্ধ পরিকর’।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে অতীতের বিভিন্ন আন্দোলনে ছাত্রলীগের নেতৃত্বের ভূমিকা থাকলেও অনেক নেতাকর্মীর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে মাঝমধ্যেই খবরের নেতিবাচক শিরোনামে আসে সংগঠনটি।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর পর থেকে দখল, দরপত্র নিয়ে সন্ত্রাস, অভ্যন্তরীণ কোন্দল থেকে সংঘর্ষের ঘটনায় বারবার সমালোচিত হয়েছে ছাত্রলীগ। ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হওয়ায় আওয়ামী লীগ নেতারাও ছাত্রলীগের সমালোচনা করতে ছাড়েননি।

নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ডে বিরক্ত হয়েই ক্ষমতার প্রথম মেয়াদে ২০০৯ সালের ৩ এপ্রিল ছাত্রলীগের সাংগঠনিক নেত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

এর মধ্যে ২০১৭ সালের ২৬ ডিসেম্বর ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা আর কোনো খারাপ খবরের শিরোনাম না হওয়ার শপথ নেয় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের কাছে।

তবে এই শপথের ঠিক দুই দিন পর ছাত্রলীগের দুই পক্ষে সংঘর্ষে বন্ধ হয়ে যায় কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এই ধারাবাহিকতা চলতে থাকে সংগঠনের সম্মেলন করে নতুন কমিটি হওয়া পর্যন্ত।