অপার সম্ভাবনাময় মিষ্টি মাল্টা চাষে ঝুঁকছে নওগাঁর কৃষকরা

প্রতিনিধি বদলগাছী (নওগাঁ) | বুধবার, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৮
অপার সম্ভাবনাময় মিষ্টি মাল্টা চাষে ঝুঁকছে নওগাঁর কৃষকরা
ঠাঠা বরেন্দ্র ভূমি বদলগাছী, পতœীতলা, সাপাহার, মহাদেবপুর, পোরশা, নিয়ামতপুর, ধামইরহাট ও নওগাঁ সদরসহ মাল্টা চাষে ঝুঁকে পরেছেন কৃষকরা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে গত দুই বছরে প্রায় ৩শত বিঘার অধিক জমিতে মাল্টার বাগান গড়ে উঠেছে। এ দিকে মাল্টা চাষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে কোন সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। মাল্টা চাষে লাভ হলে আগামিতে ঠাঠা বরেন্দ্র ভূমিতে মাল্টা চাষের বিপ্লব ঘটবে বলে এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বদলগাছী হর্টিকালচার সূত্রে জানাযায়, নওগাঁ জেলায় অন্যান্য ফসলের চেয়ে কম চাহিদা সম্পন্ন মাল্টা চাষে বিপ্লব ঘটানো ও বিদেশ থেকে আমদানির চাপ কমাতে হর্টিকালচার ২০১৫ সাল থেকে বারি-১ জাতের মাল্টার গাছ তৈরী শুরু করে। ইত্যে তিন হাজার চারা বিক্রি করা হয়েছে। হর্টিকালচারের সহযোগিতায় জেলায় গত তিন বছরে একশ’টি মাল্টার প্রদর্শণীয় পল্ট তৈরী করা হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পানির স্তর নীচে নেমে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমে ধানের আবাদ ছাড়া তেমন কোন ফসলের চাষ হয় না ঠাঠা বরেন্দ্র ভূমি বদলগাছী, পতœীতলা, পোরশা, সাপাহার ও নিয়ামতপুর উপজেলায়। বছরের অধিকাংশ সময় পতিত থাকা জমিতে কৃষকরা গড়ে তুলেছেন আম বাগান। আমে অনেক সময় লোকসান হওয়ায় আমের পরিবর্তে অন্যান্যে ফসল চাষের চিন্তা শুরু করেন ঐ সব এলাকার কৃষকরা। এমতাবস্তায় টেলিভিশনে মাল্টা চাষের প্রতিবেদন দেখে দেড় বছরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতা ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে মাল্টা চাষ শুরু করেছেন ঐসব উপজেলার কৃষকরা।
পোরশা উপজেলার তেঁতুলিয়া গ্রাামের ওবাইদুল্লাহ জানান, তিনি আম বাগানের পাশাপাশি বারি-১ জাতের ৬শ’টি মাল্টা গাছ লাগিয়ে ছিলেন। ৬শ’টি মালটা গাছের মধ্যে এবছর ২শ’টি মাল্টা গাছে মাল্টা ধরেছে। ২শ’টি গাছে প্রায় ৩০ থেকে ৭০টি করে মাল্টা ধরেছে। তিনি আশা করছেন এবছর তিনি ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকার মাল্টা বিক্রি করবেন।
পোরশা উপজেলার ছাউল গ্রামের আবু বক্কর মন্ডল জানান, দুই বছর আগে মাল্টা চাষ শুরু করতে প্রথমে জমির মাটি খনন করে বিভিন্ন সার মিশ্রণ করে এক মাস রেখে দেয়ার পর ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৭শ’ টি চারা এনে আমের বাগানের মধ্যে লাগান। এর মধ্যে ভিয়েতনাম দেশের ৫শ’ এবং বাঁকি ২শ’টি বারি-১ জাতের মাল্টা লাগান। প্রায় ৪শ’টি মাল্টা গাছে মাল্টা ধরেছে। বারি-১ জাতের চেয়ে ভিয়েতনাম দেশের মাল্টার ফল তুলনামূলক বড় এবং মিষ্টি।
তিনি আরও জানান, গত কয়েক মাস আগে মাল্টা গাছের পাতা পচে কুঁকড়ে মরে যাচ্ছিল। কৃষি বিভাগকে জানালে তারা পাতা নিয়ে যায়। এরপর তারা কোন প্রতিকার মূলক পরামর্শ বা কোন সহযোগিতা করেনি। এতে হতাশা দেখা দিয়েছিল। স্থানীয় ভাবে পরিচর্যা করে উপকার পেয়েছি। মাল্টা চাষ লাভজনক হলে আম বাগানটি কেটে ফেলবেন এমনটাই জানালেন এই মাল্টা চাষি।
ছাউল গ্রামের আশরাফ আলী মন্ডল বলেন, এলাকার অনেকেই মাল্টা চাষে উদ্বুদ্ধ হলেও মাল্টা চাষীদের মাল্টা গাছে রোগবালাই দেখা দিলে কৃষি বিভাগ থেকে তেমন সহযোগিতা না পাওয়ায় স্থানীয়ভাবেই নিম গাছের রস দিয়ে রোগবালাই দমন করা হয়েছে। আমাদের মাল্টা চাষ দেখে অনেকেই পরামর্শ নেয়ার পাশাপাশি মাল্টা চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন।
 সোহেল রানার বাগান পতœীতলা উপজেলার রূপগ্রাম নামক গ্রামে তার বাগানে বদলগাছী হর্টিকালচার থেকে দুই বছর আগে ২০টি মাল্টা গাছ পর্দশনী হিসাবে পান। এরপর সিলেট থেকে আরো ৬০টি মাল্টা গাছ এনে লাগান তিনি। গাছগুলোর মধ্যে ৪২টি গাছে ৩০ থেকে ৪৫টি পর্যন্ত মাল্টা ধরেছে। পতœীতলা উপজেলার কৃষি বিভাগ থেকে বিভিন্ন সময় তাকে পরামর্শ দেয়ায় গাছগুলো বেশ ভালো হয়েছে।
পতœীতলা উপজেলার কৃষি অফিসার শ্রী প্রকাশ চন্দ্র সরকার জানান, সোহেল রানাকে সব সময় সহযোগিতা করা হচ্ছে। সোহেল রানার মতো অনেক যুবক মাল্টা চাষের জন্য পরামর্শ নিয়ে যাচ্ছেন। গত দেড় বছরের মধ্যে এই উপজেলায় প্রায় ২৫টি মাল্টার প্রদর্শনী পল্ট গড়ে তোলা হয়েছে।
পোরশা উপজেলার উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা সেলিম রেজা জানান, বরেন্দ্রভূমির এসব জমিতে বর্ষাকালে শুধু মাত্র আমন ধান চাষ করা হতো। আমন ধানের চেয়ে আম চাষে লাভবান হওয়ায় কৃষকরা আম চাষে ঝুঁকে পরেছেন। আম চাষের চেয়ে মাল্টা চাষে ঝুঁকি কম এবং কম সেচ লাগে এ জন্যেই কৃষকদের মাল্টা চাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।