নারায়ণগঞ্জে চার শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগে অধ্যক্ষ আটক

স্টাফ রিপোর্টার | রবিবার, জুলাই ২৮, ২০১৯
নারায়ণগঞ্জে চার শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগে অধ্যক্ষ আটক

নারায়ণগঞ্জে আবারো মাদ্রাসার ৪ আবাসিক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগে মুফতি মোস্তাফিজুর রহমান জসিম নামে এক মাদ্রাসা শিক্ষককে আটক করেছে র‌্যাব। গতকাল  দুপুরে ফতুল্লার ভূঁইঘর এলাকার আল আরাফাহ্‌ রাইস মিল সংলগ্ন দারুল হুদা আল ইসলাম মহিলা মাদ্রাসা থেকে তাকে আটক করা হয়।

আটককৃত জসিম দারুল হুদা আল ইসলাম মহিলা মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা এবং অধ্যক্ষ। গত ছয় বছর যাবৎ ওই এলাকার প্রবাসী আলাউদ্দিন মিয়ার বাড়ির নিচ ও দোতলা ভাড়া নিয়ে জসিম মাদ্রাসাটি পরিচালনা করে আসছিলেন। জসিমের ধর্ষণের শিকার মাদ্রাসার সাবেক দুই ছাত্রী র‌্যাব-১১’র কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ করলে র‌্যাব তদন্ত শেষে ঘটনার

প্রাথমিক সত্যতা পেয়ে গতকাল দুপুরে তাকে আটক করে। জসিমের লালসা থেকে রেহাই পায়নি অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া তার আপন ভাতিজিও। র‌্যাব এ পর্যন্ত জসিমের লালসার শিকার হয়েছে এমন ৪ ছাত্রী সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছে। এ সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন, র‌্যাব-১১’র উপ-অধিনায়ক মেজর নাজমুস সাকিব।
জসিমের লালসার শিকার হয়েছে তার মাদ্রাসার তৃতীয় থেকে আলিম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা, যারা সবাই মাদ্রাসাটির আবাসিক ছাত্রী ছিল। স্ত্রী ও ৩ সন্তানকে নিয়ে জসিম মাদ্রাসারই একটি কক্ষে বসবাস করছিল। গ্রেপ্তারকৃত মোস্তাফিজুর রহমান জসিম নেত্রকোনা জেলার সদর থানার কাওয়ালীকোন এলাকার মো. ওয়াজেদ আলীর ছেলে।

ঘটনার শিকার দুই শিক্ষার্থী গতকাল গণমাধ্যম কর্মীদের জানিয়েছে, অধ্যক্ষ জসিমের স্ত্রীর কাছে ঘটনাগুলো জানিয়েও তারা কোনো ফল পায়নি। উল্টো এ বিষয়ে তাদের চুপ থাকতে এবং কাউকে না জানাতে বলেছিলেন অধ্যক্ষ জসিমের স্ত্রী। এ থেকে তাদের অনুমান জসিমের অপকর্মে তার স্ত্রীর মৌন সমর্থন ছিল।
মাদ্রাসার কিতাব বিভাগের শিক্ষক জুবায়ের আহমেদ বলেন, মাদ্রাসায় মোট ৯৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। যার মধ্যে ৩০ জন শিক্ষার্থী আবাসিক। মাদ্রাসায় মোট ১৭ জন শিক্ষকের ১১ জন নারী এবং জসিম সহ ৬ জন পুরুষ শিক্ষক রয়েছেন।

ঘটনার শিকার দুই মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর বরাত দিয়ে র‌্যাব-১১’র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আলেপ উদ্দিন বলেন, গত ২৪শে জুলাই ঘটনার শিকার এক মাদ্রাসাছাত্রী ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ জসিমের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ দেয়া হয়। অভিযোগের প্রেক্ষিতে র‌্যাবের একটি টিম গোপনে তদন্ত করে এ বিষয়ের সত্যতা পান। র‌্যাবের তদন্ত টিমটি আরো জানতে পারে, অতীতে জসিমের বিরুদ্ধে এ ধরনের আরো অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু স্থানীয় একটি গ্রুপ ওই সময় আর্থিক সুবিধা নিয়ে জসিমকে রক্ষা করে।

তিনি আরো জানান, গত ২৭শে জুন সিদ্ধিরগঞ্জের অক্সফোর্ড হাই স্কুলের শিক্ষক আরিফুল ইসলাম এবং গত ৪ঠা জুলাই ফতুল্লার মাহমুদনগর এলাকায় বাইতুল হুদা ক্যাডেট মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আল আমিন ছাত্রীদের ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার হলে সেই সংবাদ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়। তা দেখেই জসিমের ধর্ষণের শিকার শিক্ষার্থীরা সাহস করে র‌্যাবের কাছে অভিযোগ করে।

তিনি বলেন, আগের অভিযানগুলোর ভিত্তিতে যখন ভিকটিমরা দেখতে পারছে র‌্যাব যৌন হয়রানির শিকার ছাত্রীদের নাম-পরিচয় গোপন রাখছে। এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি তাদের আস্থার কারণেই নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে বিষয়টি অবহিত করছে।
ঘটনার শিকার দুই মাদ্রাসা শিক্ষার্থী সাংবাদিকদের বলেন, গত ৩ মাসে জসিম তাদের সঙ্গে এসব ঘটনা ঘটিয়েছে। এর আগেও সে এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে বলে ঘটনার শিকার ছাত্রীদের অভিযোগ।

ধর্ষণের শিকার আলিম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানায়, তিনি মাদ্রাসার ছোট মেয়েদের দিয়ে তার অফিস কক্ষে টার্গেট করা ছাত্রীদের ডেকে নিতো। এরপর টুকটাক কাজ করার কথা বলে কৌশলে সে রুমের দরজা আটকে দিতো এবং পেছন থেকে জড়িয়ে ধরতো। এরপর মুখ চেপে ধরে বেডে নিয়ে ধর্ষণ করতো। ধর্ষণ শেষে এসব ঘটনা কাউকে না জানাতে শাসিয়ে ছেড়ে দিতো। একই কায়দায় তিন দফা ধর্ষণের শিকার হয় তৃতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থী।

ঘটনার পর ওইসব শিক্ষার্থী মাদ্রাসা ছেড়ে চলে যায়। তবে যাওয়ার আগে এ বিষয়টি অধ্যক্ষ জসিমের স্ত্রীকে জানিয়ে যায় তারা। তবে, উল্টো জসিমের স্ত্রী এ বিষয়ে কাউকে কিছু না বলতে ছাত্রীদের শাসায়। তবে সবচেয়ে দুঃখজনক যে জসিমের লালসার শিকার হয়েছে তারই মাদ্রাসায় পড়া তারই আপন ভাতিজি। ঘটনার পর তার ভাতিজি অন্য শিক্ষার্থীদের বিষয়টি জানিয়েছে। তবে গতকাল কথা বলার জন্য জসিমের সেই ভাতিজিকে আলাদা ভাবে শনাক্ত করা যায়নি।

র‌্যাব-১১’র উপ-অধিনায়ক মেজর নাজমুস সাকিব বলেন, ঘটনার শিকার ছাত্রীদের প্রাথমিক অভিযোগে র‌্যাবের একটি টিম এ বিষয়ে তদন্ত করে। প্রাথমিক তদন্তে বিষয়টির সত্যতা পাওয়া যায়। এরপর তাকে আটক করা হয়েছে।

তার কাছ থেকে ঘটনার প্রমাণস্বরূপ কিছু মোবাইল রেকর্ড উদ্ধার করা হয়েছে। র‌্যাব এ বিষয়ে আরো নিবিড় ভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন করবে বলে জানান তিনি।
উল্লেখ্য, এর আগে গত ২৭শে জুন সিদ্ধিরগঞ্জের অক্সফোর্ড স্কুলের শিক্ষক আরিফুল ইসলামকে তারই স্কুলের ২০ শিক্ষার্থীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের অভিযোগে এবং গত ৪ঠা জুলাই ফতুল্লার বাইতুল হুদা ক্যাডেট মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ মো. আল আমিনকে মাদ্রাসার কোমলমতি ১২ শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়।