ময়মনসিংহে এমপিদের নাম ভাঙিয়ে দুর্নীতি অনিয়ম,সন্ত্রাস

কামরুজ্জামান মিনহাজ/জাহাঙ্গীর আলম,ময়মনসিংহ | বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১৭, ২০১৯
 ময়মনসিংহে এমপিদের নাম ভাঙিয়ে দুর্নীতি অনিয়ম,সন্ত্রাস

ময়মনসিংহে কয়েক এমপি’র নাম ভাঙিয়ে কয়েকটি চক্রের চলছে বেআইনী কার্যক্রম । থানা কার্যালয়, উপজেলা পরিষদ, সাব রেজিস্ট্রি অফিস, ভূমি অফিস, প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসে এদের দেখা মেলে । এরাই আবার দরবার শালিস, জমি দখলসহ হেন বেআইনী কার্যক্রম নেই যারা তারা করছে না।
সংশ্লিষ্ট উপজেলাবাসীর কাছে এই দালাল শ্রেণির লোকজন এক মূর্তিমান আতঙ্ক।

এরা নিজেদেরকে এমপি’র  নিজস্ব লোক দাবি করে, সন্ত্রাসী ক্যাডার বাহিনী লেলিয়ে দিয়ে নিরীহ লোকজনকে মারধর, ভূমি দখল, টেন্ডারবাজি, প্রতিপক্ষের বাড়িঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া, হামলা, লুুটপাট,ভাংচুর, হুমকিসহ সব ধরনের অবৈধ কাজই করছে । কেও প্রকাশ্যে তাদের বিরুদ্ধাচরণ করলে মোবাইল ফোনে হুমকি-ধমকি দেয়া হয় ।

এরা ওই সব এমপিদের ঘিরে রেখে চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসী আর মাদক ব্যবসাও করছে । অনেকেই দুঃখ ও অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। এদের অপতৎপরতার কারণে, দলীয় কার্যক্রম অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়েছে।
এরা এমপির 'নিজস্ব লোক'হিসাবে সমধিক পরিচিত । অনেক এমপি এদের দিয়েই পরিচালনা করছেন সব কার্যক্রম। তাদের ঘিরে অন্য দল থেকে আসা সুবিধাভোগী, এমনকি অপরাধে জড়িত অনেকেরই আনাগোনা বেড়েছে এমন অভিযোগও রয়েছে।

 জেলার অনেক স্থানে থানা, ইউনিয়ন, ওয়ার্ডে সম্মেলনও হয়েছে । কোথাও কমিটি গঠিত না হওয়ায় দলীয় কার্যক্রমে নতুন করে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। ফলে স্থানীয় এমনকি কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচিগুলোও সেভাবে সফল হচ্ছে না।
এই এমপিরা নিজ নিজ থানা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডের 'প্রস্তাবিত কমিটি' জমা দিয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের কাছে। এই সুযোগে এই এমপিদের নিজস্ব লোকজন থানা, ইউনিয়ন, ওয়ার্ডের 'প্রস্তাবিত' কমিটির নেতা পরিচয় দিয়ে সুযোগ-সুবিধা বাগিয়ে নিতে শুরু করেছেন। তারাই আবার দলের থানা-ওয়ার্ড কমিটির বড় বড় পদ বাগিয়ে নিতে তৎপর।

অভিযোগ রয়েছে, এসব এমপির কাছেই দল ও সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের ত্যাগী, দক্ষ ও নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীরা অনেকটাই অপাঙ্ক্তেয়। ২০০১ সালের পর চরম অত্যাচার-নির্যাতন ও হামলা-মামলার মুখেও এলাকায় দলকে টিকিয়ে রেখেছিলেন, এমন নেতারাও উপেক্ষার শিকার হয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন।
একাধিক নেতা জানান, এই এমপিদের 'কাছের লোক' হিসেবে পরিচিতদের মাধ্যমেই মূলত চলছে তার এলাকার দলীয় কার্যক্রম। তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে নানা সমালোচনাও।

এদের অনেকেই এসব এমপির নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসাসহ নানা অপকর্মে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
 এই এমপিদের ঘিরে থাকা ব্যক্তিদের কয়েকজন আবার বিএনপিসহ অন্য দলের রাজনীতি থেকে রাতারাতি 'আওয়ামী লীগার' বনে সুযোগ-সুবিধা বাগিয়ে নিচ্ছেন। এদের বিরুদ্ধে বালু মহাল হাট-ঘাটের ইজারা নেওয়াও অভিযোগ রয়েছে । এতে ক্ষুব্ধ এলাকার সাধারণ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা।
আগামী দলীয় নির্বাচনের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন এমপিদের ঘিরে থাকা সুবিধাবাদীদের অনেকে। আর প্রকৃত নেতাদের অনেকেই দলীয় কর্মকান্ডে অংশ নিতে অনীহা প্রকাশ করছেন । এরা হাইব্রিড নামেও পরিচিত ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, একটি গোয়েন্দা সংস্থা এসব এমপিদের চিহ্নিত করতে মাঠে কাজ করছেন । সূত্র জানায়, এই এমপিরা নিজেদের লোকদের দিয়ে দল পরিচালনা এবং বিএনপি-জামায়াতসহ অন্যান্য দল থেকে আসা লোকদের পাশাপাশি চাঁদাবাজ-টেন্ডারবাজি-মাদক ব্যবসায়ীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন ।
অভিযোগ রয়েছে, এমপির নিজস্ব লোক হিসাবে দাবী করে এরা । সরকারের দেয়া ত্রাণ বিশেষ করে টিআর, কাবিখা ও জিআরের বিশেষ বরাদ্দ, ব্রিজ, কালভার্টসহ নানান বরাদ্দ এইসব দালালদের মাধ্যমে বিশেষ  সুবিধাপ্রাপ্ত হয়ে দেয়া হচ্ছে বরাদ্দ।

দালালরা ময়মনসিংহের এই এমপিদের প্যাড সংগ্রহ করে ডিও লেটারসংবলিত বিভিন্ন ভুইফোঁড় প্রতিষ্ঠানের আবেদনপত্র তৈরি করে বরাদ্দ ভাগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এসব কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় লোকজন বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে দালাল ও সংশ্লিষ্ট অসাধু কর্মকর্তারা বনে যাচ্ছেন টাকার কুমির।

এছাড়াও এসব এমপির নামধারী লোকজনের নিয়ন্ত্রনে এখন উপজেলাগুলির  ভূমি অফিস ।  সরকারি ছুটির দিন ব্যতীত প্রতিদিন সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত এসব চিহ্নিত দালালদের ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের টেবিলের সামনে সামনে ঘুরঘুর করে।

ভূক্তভোগী আরমান হোসেন বলেন, 'ভাই কী আর করব, এ অফিসে দালাল ছাড়া কোন কাজই হয়না'। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঐ লোকরা আরো বলেন 'সরাসরি ভূমি সমস্যার জন্য অফিসের কর্তাবাবুদের কাছে যেতে চাইলেও দালালরা যেতে দেয়না, কাজ করে দেওয়ার আশ্বাসে দালালো হাতিয়ে নেয় মোটা অংকের টাকা।
 এমপির লোক দাবি করে এরা বীরদর্পে প্রতিনিয়তই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এরা এখন অঘোষিত ভূমি অফিসের দালাল । এদের অত্যাচারে ভূমি অফিসে জমির মালিকরা অতিষ্ট হয়ে পড়েছে। দালাল ছাড়া কোন ভুক্তভোগীরা ভূমি অফিসের ধারে-কাছেও যেতে পারেনা।
সাব রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতেও একই অবস্থা ।

একাধিক দলিল লেখক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ‘এখানে সিন্ডিকেট করে সব চলছে। সিন্ডিকেটের সদস্য এরা এমপির লোক দাবি করে । এদের দিয়ে পর্যাপ্ত কাগজপত্র না হলেও দলিল রেজিস্ট্রি হয়।
এ ছাড়া চুক্তিতে হয় সব ধরনের দলিল। এরাই আবার এমপির নাম ভাঙিয়ে সাব রেজিস্ট্রে অফিসের দলিল লেখক- ভেন্ডার সমিতির বিভিন্ন পদ দখল করে বসে আছেন ।

এতে ভোগান্তি ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। কমছে সরকারের রাজস্ব। এদেও দৌরাতেœ  বিরোধপূর্ণ অর্পিত সম্পত্তি, খাস খতিয়ানভুক্ত জমি এবং আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এমন জমিও রেজিস্ট্রি হচ্ছে। এসব কারণে দিন দিন স্থানীয় বিরোধ বাড়ছে ।
গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচীর আওতায় টিআর ও কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটার) বিপরীতে নামে-বেনামে ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা তছরুপের অভিযোগ উঠলেও দেখার কেও নেই ।

থানা পুলিশকেও ভয় ভীতি প্রদর্শন করে এরা । জমি বিরোধ, মিথ্যা ঘটনা সাজিয়ে মামলা, নিরীহদের ধরিয়ে দেয়ার নামে চাঁদাবাজীসহ নানান অপকর্মে জড়িত এরা। তাদের বিরুদ্ধে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন  ত্রিশালের বাসিন্ধা তপন সাহা নামের একজন ব্যাক্তি ।
ত্রিশালের এমপি হাফেজ রুহুল আমীন মাদানী তার ফেসবুকে লিখেন , আমার নাম ভাঙিয়ে কোন ধরনের ঘুষ, দুর্নীতি অনিয়ম, হয়রানি তথা অপরাধ করলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে ।